চীনামাটির বাসনে কাঠের বা ধাতব কাঠির টুংটাং শব্দ এখন আর আমাদের কাছে অপরিচিত নয়। এখন আমরা প্রায় সবাই জানি এটি চপস্টিকের শব্দ। আর এ শব্দ শুনলেই আমাদের মনে পড়ে চীন বা জাপানের কথা। কিন্তু খাবার খাওয়ার সরঞ্জাম হিসেবে চপস্টিকের ব্যবহার এ দুটি দেশেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চলের জীবনধারা, ইতিহাস এবং রন্ধনশৈলীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। চীন, জাপান, কোরিয়া উপদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটিকে তাই বিশ্বজুড়ে চপস্টিক সাংস্কৃতিকবলয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
এখন বাংলাদেশেও এমন অনেক রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে চপস্টিকের ব্যবহার চোখে পড়ে। ৭ হাজার বছর আগে উদ্ভাবিত এই সাধারণ দুটি কাঠি আজ এশীয় পরিচিতির এক শক্তিশালী প্রতীক। চাল, নুডলস বা ডাম্পলিং প্রতিটি গ্রাসের সঙ্গেই চপস্টিক বহন করে নিয়ে আসে প্রাচীন ইতিহাস, সৌজন্য এবং রন্ধন ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ আখ্যান।
প্রাচীনকালে এশিয়ায় চামচ ছিল মৌলিক ও প্রাচীন হাতিয়ার। প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত প্রমাণ বলছে, দশম শতক পর্যন্ত উত্তর চীন, কোরিয়া এবং জাপানের কিছু অংশে প্রধান দানাশস্য ছিল মিলেট বা কাউন। মিলেটের দানা চালের চেয়ে ছোট হওয়ায় এটি সাধারণত জাউ বা পরিজ হিসেবে রান্না করা হতো। এটি খাওয়ার জন্য চামচই ছিল মার্জিত ও সুবিধাজনক মাধ্যম। তবে প্রথম শতকে চীনে গমের ব্যবহার বাড়তে শুরু করলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। গম থেকে ময়দা তৈরির জন্য যাঁতার ব্যাপক প্রচলন চপস্টিক তৈরির পথ সহজ করে। ময়দা দিয়ে তৈরি নুডলস ও ডাম্পলিং খাওয়ার জন্য চামচের চেয়ে চপস্টিক অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়। পরবর্তী সময়ে এগারো শতক থেকে ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীন হয়ে কোরিয়া এবং জাপানে চালের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়লে চপস্টিকের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। চাল যেহেতু দলা পাকিয়ে থাকে, তাই তা চপস্টিক দিয়ে তোলা সহজ ছিল। ফলে ধীরে ধীরে চামচ হটিয়ে চপস্টিক এশীয় টেবিলের রাজত্ব দখল করে নেয়।
চপস্টিকের এই আধিপত্যের পেছনে রান্না পদ্ধতিরও বড় ভূমিকা ছিল। প্রাচীন চীনে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য খাবার ছোট ছোট টুকরা করে দ্রুত রান্না করার পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। এই ছোট টুকরাগুলো কড়াই থেকে তোলা বা খাওয়ার জন্য চপস্টিক হয়ে ওঠে আদর্শ সরঞ্জাম। এ ছাড়া কনফুসীয় দর্শনে টেবিলের ওপর ছুরি বা ছুরিজাতীয় সরঞ্জাম রাখা ছিল যুদ্ধ ও বর্বরতার প্রতীক। খাবারের টেবিল হবে শান্তি ও সৌজন্যের জায়গা—এ বিশ্বাস থেকে চপস্টিক হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক মার্জিত বোধের পরিচয়।
চপস্টিকের ব্যবহার পুরো এশিয়াকে এক সুতোয় গাঁথলেও এর রূপ দেশভেদে ভিন্ন। জাপানে সাধারণত বার্নিশ করা কাঠের চপস্টিক দেখা যায়। ভিয়েতনামে বাঁশের ব্যবহার বেশি আর কোরিয়ায় ঐতিহাসিকভাবে ধাতব চপস্টিক জনপ্রিয়। কোরিয়া একটি ব্যতিক্রমী দেশ, যেখানে আজও চামচ ও চপস্টিকের একটি সেট একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। এটি তাদের দীর্ঘকালীন খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির অংশ।
চপস্টিক ব্যবহারের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও আদবকেতা রয়েছে, যা প্রতিটি সংস্কৃতির মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। যেমন ভাতের ভেতর চপস্টিক খাড়া করে গেঁথে রাখা নিষিদ্ধ। টেবিলের ওপর আড়াআড়ি করে রাখা এড়িয়ে চলা হয়, আবার চপস্টিক দিয়ে পাশের কাউকে নির্দেশ করা অভদ্রতা হিসেবে গণ্য হয়। এ নিয়মগুলোর কোনোটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার থেকে এসেছে। আবার কোনোটি কেবলই সৌজন্যবোধের বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ চপস্টিক দিয়ে খাবার খান। জাপানি সুশি, চীনা রেস্তোরাঁ বা ভিয়েতনামি ফোরের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণে চপস্টিক এখন এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে পশ্চিমেও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে পরিবেশগত সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। শুধু চীনেই প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ওয়ান-টাইম বা একবার ব্যবহারযোগ্য চপস্টিক তৈরি হয়, যা পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর বিকল্প হিসেবে এখন টেকসই উপাদান এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য চপস্টিক ব্যবহারের প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে।
অনেকের কাছে চপস্টিক ব্যবহার করা কঠিন মনে হলেও সঠিক কৌশল জানা থাকলে এটি অত্যন্ত মার্জিত একটি প্রক্রিয়া। চপস্টিক ধরার সঠিক ধাপগুলো হলো:
একটি চপস্টিক পেনসিল ধরার মতো করে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে ধরুন। এটি হবে ওপরের চপস্টিক, যা নড়াচড়া করবে।
দ্বিতীয় বা নিচের চপস্টিকটি বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়া এবং অনামিকার ওপর স্থিরভাবে বসান।
নিচের চপস্টিকটি স্থির রেখে ওপরেরটি পেনসিলের মতো নড়িয়ে খাবার ধরতে হয়।
কবজি নয়, আঙুল দিয়ে চপস্টিক চালনা করা এবং খুব বেশি চাপ না দিলেই সহজে এর ব্যবহার শিখে যাবেন।
সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস, চায়নিজ ফুড হিস্ট্রি