নজরুলজয়ন্তী
‘[...] পরি চাপা রঙের শাড়ি, খয়েরি টিপ,
জাগি বাতায়নে, জ্বালি আঁখি-প্রদীপ,
মালা চন্দন দিয়ে মোর থালা সাজাই।’
— কাজী নজরুল ইসলাম
গায়ে চাপা রঙের শাড়ি জড়ানো। কপালে খয়েরি টিপের বিন্দু। প্রিয়তমকে বরণের জন্য মালা চন্দনে থালা সাজিয়ে জানালার ধারে অপেক্ষমাণ সে নারী। কল্পনা আরেকটু প্রশস্ত করলে সেই অপেক্ষমাণ নারীর পুরু কাজল টানা চোখে সুদূর থেকে আসা অতিথির জন্য তৃষ্ণা ঠাহর করা যায়। এই তৃষ্ণা যেন কৃষ্ণপক্ষে চাঁদের অপেক্ষার মতোই প্রবল। আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী। তাঁর স্মরণে তাঁরই লেখা গান থেকে প্রণয়িনীর সাজসজ্জা নিয়েই থাকছে বিশেষ আয়োজন।
কে বলে বিদ্রোহীরা প্রেমের ফাঁদে পড়ে না? প্রেম বিদ্রোহীরও ঘুম চুরি করে। প্রিয়তমার চুলের ঘ্রাণে ঘোর লাগে তাঁরও। বিদ্রোহী হলেও কবি নজরুলের হৃদয়ে তো প্রেম বেলফুল হয়ে ফুটেছিল। নজরবন্দী প্রিয়দর্শিনীকে তিনি নানা সময়ে নানা রূপে সাজিয়েছেন, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর সৃষ্টিতে। শুধু যদি নজরুলসংগীতের কথাই বলা হয়, অর্থাৎ নজরুলসংগীতের দেউড়িতে যাঁরা অহর্নিশ ঘুরে বেড়ান, তাঁদের জানতে বাকি নেই, এই সংগীত সম্ভারে প্রেমের নানান গানে কবি প্রিয়দর্শিনীর রূপ ও সাজের বর্ণনা করেছেন।
প্রেমিক তাঁর হৃদয়ের রানিকে আরাধ্য উপকরণেই সাজাতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কবি সে আশা বেঁধেই প্রেয়সীর খোঁপায় তারার ফুল গুঁজে দিয়েছেন। বিজলির জ্বলজ্বলে ফিতায় মেঘবরণ চুল বেঁধে দেওয়ার ইচ্ছেও জানিয়েছেন। শুধু কি তাই? জোছনাকে চন্দন করে গায়ে মাখাবেন প্রিয়ার, রামধনুর রং হবে আরাধ্য সে নারীর পায়ের আলতা। কী দারুণ সব উপমা!
বিদ্রোহী হলেও নজরুল কল্পনায় প্রিয় নারীদের তিনি সাজিয়েছেন একেবারে নিজের মতো করে— কল্পনার ঝাঁপি খুলে দিয়ে। কল্প স্বর্গে ভেসে চৈত্রের সন্ধ্য়েবেলায় প্রিয়দর্শিনীকে তিনি সাজিয়েছেন স্বর্গীয়রূপে। হৃদয় নিংড়ে সবটুকু লাল দিয়ে তার পায়ে আলতা পরাতে চেয়েছেন। খোঁপায় পরতে বলেছেন বেল-যূথিকার মালা।
নজরুল জানতেন, প্রেমের অনুগামী যেমন লাল গোলাপ, সজ্জার সহচর তেমন অনুষঙ্গ। চাপা রঙের শাড়ি পরে টিপ না দিলে চলবে কেন? আর সাজের পরিপূর্ণতা হিসেবে বারবার কপালের টিপে মন হারিয়েছেন তিনি।
এত কিছুই যখন হচ্ছে, তখন ফের পায়ের আলতার কথাও আরেকবার বলতে হয়। নজরুল সংগীতের সম্ভারে কয়েকটি গানে হৃদয় নিংড়ে হোক বা রংধনু থেকে রং আরোহণ করেই হোক, আরাধ্য নারীর পায়ে টুকটুকে লাল আলতা পরিয়েছেন কবি। নয়তো সাজ যেন অপূর্ণই রয়ে যেত।
এত সাজের পর সেই প্রণয়িনীর খোঁপায় তিনি গুঁজে দিয়েছেন ফুল। তাঁর গানে প্রেয়সীকে নানা ফুলে ডালা সাজাতেও দেখা যায়। গাঁদা, পলাশ, যূথী, বেলফুল, চম্পা বা চামেলি বহুবারই গান হয়ে ফুটেছে প্রেয়সীর খোঁপায়, ডালায়।