হোম > ইসলাম

হাইতির মুসলিমরা প্রতিকূলতার মাঝেও যেভাবে টিকে আছেন

তাসনিফ আবীদ

ক্যারিবীয় সাগরের দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। ছবি: সংগৃহীত

ক্যারিবীয় সাগরের দ্বীপরাষ্ট্র হাইতিতে ইসলামের ইতিহাস শুরু হয় ১৬শ শতাব্দীর শুরুতে, অর্থাৎ ১৫০২ সাল থেকে। তৎকালীন এস্পানিওলা দ্বীপে (বর্তমান হাইতি ও ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র) আফ্রিকা থেকে দলে দলে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের ধরে নিয়ে আসা হয়। এদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিলেন আফ্রিকার সমৃদ্ধ ও প্রাচীন মুসলিম সংস্কৃতির ধারক।

স্প্যানিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিকদের নির্মম নির্যাতন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের কারণে এই দাসেরা কালক্রমে তাদের মৌলিক ধর্মীয় পরিচয় হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। তবে তাদের ইসলামি ঐতিহ্যের কিছু উপাদান হাইতির লোকজ সংস্কৃতিতে আজও টিকে আছে।

হাইতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ‘হাইতিয়ান বিপ্লব’ (১৭৯১-১৮০৪), যার মাধ্যমে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রথম দাসপ্রথামুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ঐতিহাসিকদের একটি অংশের মতে—এই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান রূপকার ও মহান নেতা দুতি বুকম্যান (Dutty Boukman) ছিলেন একজন হাফেজে কোরআন বা নিষ্ঠাবান মুসলিম। প্রচলিত আছে, তিনি হাতে পবিত্র কোরআন নিয়ে অন্য দাসদের শোষকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ১৭৯১ সালে তার শাহাদাতের মাধ্যমেই মূলত এই স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ঘটে।

বিংশ শতাব্দী: মরক্কো থেকে পুনর্বিকাশ

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হাইতিতে আরব খ্রিষ্টান অভিবাসীদের আগমন ঘটে, যারা মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে ইসলাম ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক পুনরুত্থান ঘটে ১৯২০-এর দশকে। মরক্কোর ‘ফেজ’ (Fes) নামক গ্রাম থেকে ১৯টি মুসলিম পরিবার হাইতিতে পাড়ি জমায়। তাদের হাত ধরেই স্থানীয় স্তিমিত হয়ে পড়া মুসলিমদের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ তৈরি হয় এবং ইসলাম আবার বিকশিত হতে শুরু করে।

আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘ কয়েক দশক হাইতির মুসলিমদের কোনো স্থায়ী মসজিদ বা মাদ্রাসা ছিল না। অবশেষে ১৯৮৫ সালে একটি আবাসিক বাড়িকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয় এবং সেখানে একটি মিনার নির্মাণ করা হয়, যা ছিল দেশটির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি কেন্দ্র।

রাজনীতি ও সমসাময়িক অগ্রগতি

বর্তমানে হাইতির মুসলিমদের সিংহভাগই স্থানীয় আদিবাসী হাইতিয়ান, যারা পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন মরক্কো এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো থেকে আসা অভিবাসীরা। হাইতির সংবিধানে রাষ্ট্রীয় কোনো ধর্ম না থাকলেও এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও, মুসলিমরা স্বাধীনভাবে ধর্মপালনের অধিকার পান।

২০০০ সালে হাইতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়। সান রাফায়েল অঞ্চল থেকে ‘ফ্যানমি লাভালাস’ দলের হয়ে নাভুন মার্সেলুস (Nawoon Marcellus) প্রথম মুসলিম হিসেবে দেশটির ‘ডেপুটি অব চেম্বার’ (সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হন।

২০১০ সালের ভূমিকম্প ও পরবর্তী পরিবর্তন

২০১০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর হাইতির মুসলিম সমাজের পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিম সাহায্যকারী সংস্থা ও ত্রাণ দল হাইতিতে আসে। তাদের মানবিক কার্যক্রম ও আচরণের মুগ্ধ হয়ে বহু স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। ২০১১ সালের মধ্যে রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সেই অন্তত ৫টি মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত ইসলাম ভিত্তিক নৈশকালীন অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়।

মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার

বর্তমানে হাইতির বিভিন্ন শহর যেমন—পোর্ট-অ-প্রিন্স, ক্যাপ-হাইতিয়ান, গোনাভিস, মিরাগোয়ান ও কেয়েস-এ বেশ কয়েকটি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপনা হলো:

  • মসজিদুল মুনাওয়ার (গোনাভিস) : এটি এই অঞ্চলের প্রথম মসজিদ। ২০০৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিমিশনের (MINUSTAH) অংশ হিসেবে দায়িত্বরত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা মেজর সাইফুল্লাহ এটি নির্মাণ করেন। তিনি তার বাবা এবং পাকিস্তানের প্রবীণ অ্যাথলেট মুনাওয়ার সুলতান রান্ধাওয়ার নামে মসজিদটির নামকরণ করেন। বর্তমানে এটি স্থানীয় নবদীক্ষিত মুসলিমদের দ্বারা পরিচালিত একটি দাতব্য কেন্দ্র।
  • ফাতিহা মসজিদ: এর ইমাম আবদুল আল-আলি কানাডায় থাকাকালীন ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে তিনি মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
  • দারুল উলুম (মিরাগোয়ান) : মুফতি শহীদ মোহাম্মদ মিরাগোয়ান এলাকায় একটি দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা পুরো দেশের মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

এ ছাড়া, হাইতিতে বর্তমানে দুটি ইসলামি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। স্থানীয় পরিসংখ্যান মতে, হাইতির সাধারণ স্কুলগুলোর প্রায় ৫% শিক্ষকই মুসলিম।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

অগ্রগতি সত্ত্বেও হাইতির মুসলিমদের কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। হাইতি সরকার এখনো ইসলামি বিবাহরীতি (নিকাহ) কিংবা মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের (কাজি/ইমাম) আইনি স্বীকৃতি দেয় না। এ ছাড়া, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় মুসলিমদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তা সত্ত্বেও, প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে হাইতির মুসলিম সমাজ নিজেদের একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সম্প্রদায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। দাসপ্রথার শিকল ভেঙে যে ইসলামের আগমন ঘটেছিল, আজ তা হাইতির মাটিতে এক নতুন সম্ভাবনার আলো ছড়াচ্ছে।

-উইকিপিডিয়া অবলম্বনে

নামাজে সালাম ফেরানোর সঠিক নিয়ম

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২০ জুন ২০২৬

মুসলিমদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি চালু হয়েছিল যেভাবে

আশুরা ও কারবালার আলোকে মহররমের ৫ শিক্ষা

মেক্সিকোতে মসজিদ গড়ে ওঠার অজানা ইতিহাস

ইবাদত-বন্দেগিতে আগ্রহ বাড়াবেন যেভাবে

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৯ জুন ২০২৬

দোয়া কবুলের জন্য যে নিয়মগুলো মানতে হবে

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৮ জুন ২০২৬

ইতিহাসে প্রথমবার রেকর্ড ১৩টি মুসলিম দেশ খেলছে বিশ্বকাপে