ইতিহাসের পাতায় ‘ফেরাউন’ কোনো সাধারণ নাম নয়, বরং এটি চরম জুলুম, অহংকার ও খোদাদ্রোহিতার এক নিকৃষ্টতম প্রতীক। নিজেকে ‘সর্বোচ্চ প্রভু’ দাবি করা এই দুনিয়াবি খোদার পতন হয়েছিল অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে। লোহিতসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে তাঁর সলিলসমাধি আজও বিশ্ববাসীর জন্য এক জাগ্রত সতর্কবার্তা।
‘ফেরাউন’ মূলত প্রাচীন মিসরের রাজাদের রাজকীয় উপাধি। পবিত্র কোরআনে যে ফেরাউনের কথা বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় রামসিস (বা মিনফাতাহ)। তাঁর শাসনামলে মিসরে বনি ইসরাইলদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। তিনি এতটাই দাম্ভিক ছিলেন যে, পবিত্র কোরআনের সুরা নাজিয়াতে বর্ণিত হয়েছে—‘সে নিজেকে ‘‘রাব্বুল আলা’’ বা শ্রেষ্ঠ প্রতিপালক ঘোষণা করেছিল।’
আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে শোধরানোর সুযোগ দিতে হজরত মুসা (আ.)-কে তাঁর কাছে পাঠান। মুসা (আ.) তাঁকে একত্ববাদের দাওয়াত দেন এবং বনি ইসরাইলদের মুক্তি দিতে বলেন। কিন্তু ফেরাউন মুসা (আ.)-কে জাদুকর ও মিথ্যাবাদী আখ্যা দিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। হাজার হাজার পুত্রসন্তানকে হত্যা করেও যখন তিনি মুসা (আ.)-কে দমাতে পারলেন না, তখন শুরু হলো আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা।
ফেরাউনের অত্যাচার যখন চরমে পৌঁছাল, আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিসর ত্যাগ করেন। পেছনে ১৬ লাখের বিশাল বাহিনী নিয়ে ধাওয়া করেন ফেরাউন। সামনে লোহিতসাগর, পেছনে শত্রু বাহিনী—বনি ইসরাইলরা যখন আতঙ্কিত, তখন আল্লাহ মুসা (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন সাগরে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে।
লাঠির আঘাতে সমুদ্র বিভক্ত হয়ে ১২টি শুকনো রাস্তার সৃষ্টি হলো। মুসা (আ.) তাঁর জাতিসহ নিরাপদে পার হয়ে গেলেন। ফেরাউন দম্ভভরে সেই রাস্তা দিয়ে অনুসারীসহ সাগরের মাঝপথে পৌঁছামাত্রই আল্লাহর আদেশে পানি আবার একাকার হয়ে যায়। উত্তাল ঢেউয়ের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় ফেরাউন ও তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী।
ডুবে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যখন ফেরাউন বুঝতে পারলেন তাঁর মৃত্যু অনিবার্য, তখন তিনি চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন:
‘আমি বিশ্বাস করলাম বনি ইসরাইলরা যে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর আমি আজ তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউনুস: ৯০)
কিন্তু মৃত্যু যখন ঘাড়ের ওপর এসে দাঁড়ায়, তখনকার তওবা আল্লাহ কবুল করেন না। হাদিসে এসেছে, ফেরাউনের এই ছলনাময়ী ডাক শুনে জিবরাইল (আ.) সমুদ্রের কালো কাদা তাঁর মুখে ঢেলে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি আল্লাহর রহমত লাভের সুযোগ না পান।
ফেরাউনের পতন ও বনি ইসরাইলদের মুক্তির এই মহান ঘটনাটি ঘটেছিল আরবি ১০ মহররম বা আশুরার দিনে। এই খুশিতে হজরত মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় এসে ইহুদিদের এই দিনে রোজা রাখতে দেখে বলেছিলেন, ‘মুসার ওপর আমাদের দাবি তোমাদের চেয়ে বেশি।’ তাই মুসলিমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ১০ মহররমের সঙ্গে আগে বা পরে মিলিয়ে দুটি রোজা পালন করে থাকেন।