খিভা থেকে আমু দরিয়া (প্রাচীন অক্সাস নদী) পার হলেই চোখে পড়ে মাওয়ারাননাহার বা ট্রান্স-অক্সিয়ানার দিগন্ত। এই জনপদেই গড়ে উঠেছে উজবেকিস্তানের দুই গৌরবোজ্জ্বল শহর—সমরকন্দ ও বুখারা। তবে সব ছাপিয়ে বুখারাকে বলা হয় ‘কুব্বাতুল ইসলাম’ বা ইসলামের গম্বুজ; যা শতাব্দীকাল ধরে ঐতিহ্য, পাণ্ডিত্য এবং সুফি ঐতিহ্যের এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বুখারা ছিল পণ্ডিত, সুফি-সাধক, কবি এবং বিজ্ঞানীদের সূতিকাগার। এর মাদ্রাসা আর প্রাচীন স্থাপত্যগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বয়ে চলা সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষী। সিল্ক রোডের সেই ব্যস্ত দিনগুলোর স্মৃতি আজও এখানকার সরাইখানা আর প্রাচীন বাজারগুলোতে অম্লান।
সপ্ত পীরের পদচ্ছাপ: বুখারার পরিচয় নকশবন্দি তরিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (রহ.)-এর মাজার ছাড়াও এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আবদুল খালিক গাজদুওয়ানি, আরিফ রিভগেরি, মাহমুদ ইনজিরফাগনি, আলী রামিতেনি, মুহাম্মদ বাবা সামাসি এবং সাইয়িদ আমির কিলাল। এই সাতজন মহান সাধক বা ‘সপ্ত পীর’-এর উপস্থিতির কারণে বুখারা আজ মুসলিমবিশ্বের এক আধ্যাত্মিক তীর্থস্থান। এখানকার গলিগুলোতে হাঁটলে হৃদয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি অনুভূত হয়।
ঐতিহ্যের স্বাদ: বুখারার আধ্যাত্মিক আবহাওয়া শুধু এর স্থাপত্যে নয়, মিশে আছে দৈনন্দিন জীবনের ছন্দেও। ভোরের আলো ফুটতেই বাজারের গলিগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে তাজা ফল, সুগন্ধি মসলা আর কারুকার্যময় পোশাকের পসরা নিয়ে। বাতাসে ভাসে জিরা আর ধনিয়ার সুবাস, যার সঙ্গে মিশে যায় তন্দুর থেকে সদ্য নামানো গরম রুটির ঘ্রাণ।
বুখারা ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি আপনি এখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘পোলো’ বা পোলাওয়ের স্বাদ না নেন। ভেড়ার মাংস, গাজর আর বিশেষ মসলায় তৈরি এই খাবারটি বুখারার রন্ধনশৈলীর গর্ব। এ ছাড়া তন্দুরে সেঁকা গরম-গরম সামসা আর মেহমানদারির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিবেশন করা সবুজ চা এবং সঙ্গে কালো আঙুর ভোজনরসিকদের মনে গেঁথে থাকবে চিরকাল।
এখানকার আতিথেয়তার রীতিনীতিও বেশ চমৎকার। মেহমানরা অনেক সময় নিজেদের চামচ সঙ্গে আনেন এবং চায়ের প্রথম কাপটি সব সময় গৃহকর্তাকে পরিবেশন করা হয়। প্রাচীনকালে বিষপ্রয়োগ থেকে বাঁচার সতর্কতা হিসেবে এই রীতির প্রচলন হলেও আজ তা উষ্ণ অভ্যর্থনার ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।
পাথর কথা বলে যেখানে: বুখারার প্রতিটি পাথর আর ইটের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘আর্ক দুর্গ’ (Ark Fortress) ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল, যা আমিরদের প্রাসাদ আর কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১২২০ সালে মঙ্গোলদের আক্রমণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ষোড়শ শতাব্দীতে তা পুনঃসংস্কার করা হয়।
অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো ‘বলো হাউস মসজিদ’। ২০টি বিশাল কাঠের স্তম্ভের কারণে একে ‘চল্লিশ স্তম্ভের মসজিদ’ বলা হয়, কারণ সামনের জলাধারে স্তম্ভগুলোর নিখুঁত প্রতিফলন দেখা যায়। এ ছাড়া ১১২৭ সালে নির্মিত ‘পো-ই-কালিয়ান’ মিনারটি বুখারার প্রধান প্রতীক। ৪৬.৫ মিটার উচ্চতার এই মিনারটি একসময় কাফেলাগুলোর পথপ্রদর্শক বা লাইটহাউস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর পাশেই আছে ২৮৮টি গম্বুজবিশিষ্ট বিশাল ‘কালিয়ান মসজিদ’, যেখানে একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন।
শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ধারা আজও ধরে রেখেছে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত ‘মির আরব মাদ্রাসা’। ১১৪টি হুজরা বা কক্ষবিশিষ্ট এই মাদ্রাসার প্রতিটি কক্ষ পবিত্র কোরআনের ১১৪টি সুরার প্রতীক। এটি আজও একটি সক্রিয় মাদ্রাসা হিসেবে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে জ্ঞান দান করে চলেছে।
বিয়োগান্ত ইতিহাস ও বর্তমান: বুখারা যেমন তার জৌলুশের জন্য খ্যাত, তেমনি তার ট্র্যাজেডিও কম নয়। কথিত আছে, তৈমুর যখন এই শহরের বিশাল লাইব্রেরিটি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, তখন বইয়ের আগুনের শিখায় আকাশ কয়েক দিন আলোকিত ছিল। স্থানীয়রা আজও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘যদি সেই অমূল্য পাণ্ডুলিপিগুলো আজ বেঁচে থাকত, তবে মুসলমানরা অনেক আগেই মহাকাশ জয় করত।’
ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্টে থাকা বুখারা আজও সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক মিলনস্থল। তুর্কি, পারস্য, ইহুদি, আরব ও রুশ—নানা জাতির ছোঁয়ায় বুখারা আজ তার বর্তমান পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। বুখারা যেন নিছক একটি শহর নয়, এটি এমন এক অনুভূতির নাম, যেখানে ইতিহাস আর আধ্যাত্মিকতা একই সুতোয় গাঁথা।