হোম > ইসলাম

শিশুশ্রম প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

তাসনিফ আবীদ

আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। একটি সুন্দর, সুশোভিত ও গৌরবময় সমাজ বিনির্মাণে শিশুদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পবিত্র কোরআনে শিশুদের পার্থিব জীবনের শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য হিসেবে আখ্যায়িত করে মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ (সুরা কাহাফ: ৪৬)

পরিতাপের বিষয় হলো, আধুনিক এই যুগে এসেও বিশ্বব্যাপী শিশুরা চরম অবহেলার শিকার। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত। বাংলাদেশের চিত্রও এর বাইরে নয়; একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কম খরচে বেশি মুনাফা লাভের আশায় কোমলমতি শিশুদের শ্রম শোষণ করছে।

শ্রমিক হিসেবে শিশুরা কেন উপযুক্ত নয়

ইসলামে শ্রমজীবী জীবন ও হালাল উপার্জনকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হলেও, শিশুশ্রমকে কোনোভাবেই সমর্থন করা হয়নি। এর মূল কারণ, ইসলামের দৃষ্টিতে একজন শ্রমিকের যে শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা থাকা আবশ্যক, শিশুদের মাঝে তা থাকে না। পবিত্র কোরআনে আদর্শ শ্রমিকের যোগ্যতা বর্ণনা করে বলা হয়েছে—‘নিশ্চয়ই আপনার মজুর (শ্রমিক) হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা কাসাস: ২৬)

যেহেতু শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে অপরিণত, তাই তারা ‘শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত’ হওয়ার এই মানদণ্ডে পড়ে না। এ ছাড়া, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, একজন শ্রমিককে মালিকের অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্পদের জিম্মাদার বা রক্ষক হতে হয় এবং এ নিয়ে তাঁকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। (সহিহ বুখারি)। অথচ কোনো শিশুর পক্ষে এমন গুরুদায়িত্ব পালন করা বা সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। আর ইসলামের মৌলিক নীতি হলো—কারও ওপর তার সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপানো যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব দেন না, যা তার সাধ্যাতীত।’ (সুরা বাকারা: ২৮৬)। অতএব, কোমলমতি শিশুদের দিয়ে সাধ্যের বাইরের কষ্টকর কাজ করানো ইসলামের এই শাশ্বত বাণীর স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বড় ধরনের জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।

শিশুদের অধিকার ও ভরণপোষণে ইসলামের বিধান

ইসলামের পারিবারিক ও সামাজিক বিধান অনুযায়ী, কোনো পিতা বা অভিভাবক তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে উপার্জনের জন্য বাধ্য করতে পারবেন না। সমাজের যেসব শিশু এতিম, মিসকিন ও হতদরিদ্র—যাদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ নেই, ইসলামে তাদের দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। রাষ্ট্র তাদের জন্য বিশেষ বায়তুল মাল বা তহবিল গঠন করবে এবং সেখান থেকে তাদের ভরণপোষণ ও যাবতীয় মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে। (রদ্দুল মুহতার)। ফলে জীবন ধারণের তাগিদে কোনো শিশুকে বাধ্য হয়ে শ্রমিকে পরিণত হতে হবে না।

শিশুদের লালন-পালনে নবীজি (সা.)-এর আদর্শ

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করে তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সুশিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। হাদিসে এসেছে—১. ‘শিশুরা হলো জান্নাতের প্রজাপতি।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ)। ২. ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের মহৎ করে গড়ে তোলো এবং তাদের উত্তম আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (সহিহ মুসলিম)। ৩. ‘সন্তানকে আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া সম্পদ দান করার চেয়ে উত্তম।’ (সুনানে বায়হাকি)। ৪. শিশুদের প্রতি কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়ে নবীজি (সা.) কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—‘যে ব্যক্তি আমাদের শিশুদের স্নেহ করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ)।

এমনকি শিশুদের সঙ্গে কর্কশ বা কঠোর আচরণ করার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক পিতাকে ভর্ৎসনাও করেছিলেন।

শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের করণীয়

কোরআন ও সুন্নাহর এই সুনিশ্চিত আলোকেই স্পষ্ট যে প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ইসলামে শিশুশ্রমকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শিশুশ্রমের ফলে শিশুদের মননশীলতা ধ্বংস হয়, দৈহিক ক্ষতি হয় এবং তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হয়।

বাস্তবতার নিরিখে সমাজ থেকে যদি শিশুশ্রম পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব নাও হয়, তবে অনতিবিলম্বে সকল প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধ করতে হবে। শিশুদের কর্মস্থলকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের এটি বোঝাতে হবে যে তাদের দারিদ্র্য দূর করার একমাত্র মোক্ষম হাতিয়ার হলো ‘শিক্ষা’। কাজের পাশাপাশি তাদের জন্য পড়ালেখার সুযোগ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

শিশুদের সুন্দর, নিরাপদ ও আনন্দময় শৈশব উপহার দেওয়ার দায়িত্ব শুধু পরিবারের একার নয়; বরং এটি সমাজ, বিত্তবান শ্রেণি এবং বিশেষ করে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। প্রিয় নবী (সা.) নিজেও সমাজের অসহায় ও নিরাশ্রয় শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের ব্যবস্থা করতেন। তাঁরই পরিবারে এতিম বালক আমর ইবনে আবি সালামা (রা.) সন্তানের মতো লালিত-পালিত হয়েছিলেন।

তাই আসুন, শিশুশ্রম মুক্ত একটি সুন্দর সমাজ ও দেশ গড়তে ব্যক্তি, পরিবার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সরকারি-বেসরকারি সকল সংস্থা সম্মিলিতভাবে কাজ করি। মানুষের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর এই মানবতাবাদী নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলেই আমাদের কোমলমতি শিশুরা অভিশপ্ত শিশুশ্রম থেকে মুক্তি পাবে।

খুশির সংবাদে সিজদায়ে শোকর আদায়ের বিধান

৬০ বছর আর্কাইভে বন্দী ছিল শায়খ মিনশাবির যে তিলাওয়াত

মহররম মাসের ফজিলত ও আমল

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১২ জুন ২০২৬

মদিনার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে যেভাবে বদলে দিয়েছিলেন মহানবী (সা.)

ইমামের পেছনে নামাজ আদায়ের সঠিক পদ্ধতি কী

আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠের ফজিলত

অজুর ফরজ কয়টি ও কী কী

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১১ জুন ২০২৬

অজুর গুরুত্বপূর্ণ ৪ ফজিলত