হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। তবে অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি আর্থিকভাবে ঋণগ্রস্ত থাকা সত্ত্বেও হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ ক্ষেত্রে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—ঋণ পরিশোধ না করে হজে গেলে তা কবুল বা শুদ্ধ হবে কি না।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির হজ শুদ্ধ হবে?
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত থাকা অবস্থায় হজে গেলে এবং হজের সমস্ত রুকন ও শর্ত সঠিকভাবে পালন করলে তার হজ আদায় হয়ে যাবে। হজের শুদ্ধতার সঙ্গে ঋণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে হজ করলেও কারিগরিভাবে সেই হজ ‘শুদ্ধ’ বা ‘সহিহ্’ হিসেবে গণ্য হবে।
হজ শুদ্ধ হলেও ইসলাম ঋণ পরিশোধকে হজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১. হজ ফরজ হওয়ার শর্ত: যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত এবং ঋণ পরিশোধ করলে হজ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকে না, তার ওপর হজ ফরজ নয়। তার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো পাওনাদারের ঋণ বুঝিয়ে দেওয়া।
২. ঋণ পরিশোধে অবহেলা জুলুম: সামর্থ্য থাকার পরও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করাকে মহানবী (সা.) ‘জুলুম’ বা অত্যাচার হিসেবে অভিহিত করেছেন। সহিহ্ মুসলিমের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সক্ষম ব্যক্তির গড়িমসি করা অত্যাচারের শামিল।’ (সহিহ্ মুসলিম: ৩৮৫৬)
ইসলামে ঋণের বিষয়টি এতই সংবেদনশীল যে, এটি ‘বান্দার হক’ বা মানুষের অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহ তাআলা নিজের হক (যেমন: নামাজ, রোজা) চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার হক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।
শহীদেরও ঋণ মাফ নেই: আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী শহীদের মর্যাদা অপরিসীম। কিন্তু নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘শহীদের সব পাপ ক্ষমা করা হলেও অপরিশোধিত ঋণ ক্ষমা করা হয় না।’ (সহিহ্ মুসলিম: ৪৯৯১)
রুহ ঝুলন্ত থাকে: যতক্ষণ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিনের রুহ ঝুলন্ত বা বন্ধক অবস্থায় থাকে। এমনকি নবীজি (সা.) শুরুর দিকে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাজা পড়াতেন না।
আমল দিয়ে ঋণ শোধ: কিয়ামতের দিন টাকাপয়সা দিয়ে ঋণ শোধের সুযোগ থাকবে না। সেদিন ঋণদাতার পাওনা মেটাতে হবে নিজের কষ্টার্জিত সওয়াব বা নেক আমল দিয়ে। যদি সওয়াব শেষ হয়ে যায়, তবে পাওনাদারের গুনাহের বোঝা নিজের কাঁধে নিতে হবে।
হজ একটি পবিত্র ইবাদত। এই মহৎ সফরে বের হওয়ার আগে নিজেকে সব ধরনের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করা আবশ্যক। তাই হজে যাওয়ার আগে পাওনাদারের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া অথবা যদি কিস্তিতে পরিশোধের বিষয় থাকে, তবে পাওনাদারের অনুমতি নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে তা পরিশোধের জন্য নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা বা জিম্মাদার রেখে যাওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, দুনিয়াতে মানুষের পাওনা পরিশোধ করা যতটা সহজ, পরকালে এর দায়ভার নেওয়া তারচেয়ে বহুগুণ কঠিন। তাই ঋণ নিয়ে হেলাফেলা না করে আগে ঋণমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করাই প্রকৃত মুমিনের কাজ।