রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পেয়ালা হাতে দরজায় কড়া নাড়ছে মহিমান্বিত রমজান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) থেকে শুরু হতে পারে এ বছরের প্রথম রোজা। অফুরন্ত বরকতের এই মাসে মুমিন-মুসলিমরা দিনব্যাপী পানাহার থেকে বিরত থেকে আত্মশুদ্ধির আমল করেন।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব ১০ গুণ থেকে ২৭ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, কিন্তু রোজা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে। (সহিহ্ মুসলিম: ১১৫১, মুসনাদে আহমদ: ৯৭১৪)
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রমজানের জন্য এমনভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, তাঁরা ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন, যেন তিনি তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। তারপর রমজানের পরবর্তী ছয় মাস তাঁরা আবার দোয়া করতেন যেন আল্লাহ তাঁদের রোজা ও ইবাদত কবুল করেন। এভাবে তাঁদের মধ্যে বছরজুড়ে রমজানের ছোঁয়া লেগে থাকত। (আসরারুল মুহিব্বিন ফি রামাজান: ৪২)
তাই মুমিনের জন্য জরুরি হলো, রমজানের অবিরত কল্যাণ লাভ করতে এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কারণ, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভালো প্রস্তুতি মানেই ওই কাজটির অর্ধেক পূর্ণতা বা সফলতা অর্জন।
পাঠকদের জন্য ২০২৬ সালের রমজানের আগাম ১০টি প্রস্তুতিমূলক বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো। চলুন দেখে নিই, রমজান শুরুর আগে কোন ১০টি বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি—
এ বছর রমজান শুরুর আগে মানসিকভাবে এই প্রস্তুতি গ্রহণ করা যে জীবনভর যত গুনাহ করেছি, এ রমজানে সেসব গুনাহ বা অন্যায় থেকে পরিপূর্ণ ক্ষমা পেতে হবে। সবচেয়ে বেশি সওয়াব পেতে হবে। রমজান শুরুর আগে প্রত্যেক মুমিনের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করা জরুরি।
রমজানের আগে বছরজুড়ে যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে, সেগুলোর জন্য তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। কেউ যদি ভাবে যে ‘রমজান চলে এসেছে, আর আমার সব গুনাহ এমনিতেই ক্ষমা হয়ে যাবে’—বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বরং আগে থেকে তওবা-ইস্তিগফার করে রমজানের যাবতীয় কল্যাণ লাভে নিজেকে প্রস্তুত করা খুবই জরুরি। এতে আল্লাহ আপনার আগের সব গুনাহ মাফ করে দিয়ে রমজানের যাবতীয় কল্যাণ দ্বারা জীবন সুন্দর করে দেবেন। এ জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করতে হবে—আল্লাহুম্মাগফিরলি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন।
অতীতে রমজানের কোনো রোজা কাজা হয়ে থাকলে চলতি বছরের রমজান শুরুর আগে তা যথাযথভাবে আদায় করে নেওয়া। বিশেষ করে নারীদের ভাঙতি রোজা থাকতে পারে। তাই রমজানের আগে শাবান মাসের এ সময়ে কাজ রোজা আদায় করে নেওয়া উত্তম।
রমজান সম্পর্কে কোরআন-সুন্নায় যেসব ফজিলত মর্যাদা ও উপকারিতার বর্ণনা রয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার আগেই সেসব সম্পর্কে জেনে নেওয়া। সেসব উপকার পেতে কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনাগুলো মেনে চলার প্রস্তুতি নেওয়া। মাস রমজান আসছে, মানসিকভাবে বারবার এ কথার স্মরণ ও নেক আমলের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে এ দোয়াটি বেশি বেশি করা—আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাজান।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। অর্থাৎ রমজান পর্যন্ত হায়াত দান করুন।
রাব্বুল আলামিন রমজান মাসে অনেক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। তবে এ সাধারণ ক্ষমা সবার ভাগ্যে জুটে না। কেননা এ ক্ষমা পেতে হলে দুটি কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্ষমা প্রার্থনা করে তা থেকে ফিরে আসতে হবে।
কাজ দুটি হলো
শিরক থেকে মুক্ত থাকা। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শিরক না করা। কেউ ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায়, ছোট বা বড় শিরক করে থাকলে রমজান আসার আগেই তা থেকে তওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে ফিরে আসা।
হিংসা থেকে মুক্ত থাকা। কারও প্রতি কোনো বিষয়ে হিংসা না করা। কারণ, হিংসা মানুষের সব নেক আমলকে সেভাবে জালিয়ে দেয়; যেভাবে আগুন কাঠকে জালিয়ে দেয়। তাই হিংসা পরিহার করে মনকে ক্ষমা লাভে স্বচ্ছ রাখা।
রমজান মাস আসার আগে রোজা পালনের নিয়মকানুনগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। এতে রোজা পালনে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। কোনো রোজা নষ্ট বা মাকরুহও হবে না।
রমজানে বেশি বেশি ইবাদত করতে এবং রোজা রাখার জন্য শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। বেশি বেশি কোরআন অধ্যয়ন করা। নফল নামাজ আদায় করা। তওবা-ইস্তিগফার করা। ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করা। দান-সদকা শুরু করা। যাতে এ মহড়ার বাস্তবায়ন পুরো রমজানজুড়ে সুন্দরভাবে চালানো যায়।
চলতি বছরের রমজান মাস আসার আগে বিগত রমজানের নেক আমলগুলো করতে না পারার কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা। যেমন—কেন নিয়মিত কোরআন অধ্যয়ন করা হয়নি? কেন তারাবি আদায় করা হয়নি? কেন দান-সহযোগিতা করা হয়নি? কেন ইতিকাফ করা হয়নি এবং কেন রোজাদারকে ইফতার করানো হয়নি?
উল্লিখিত বিষয়গুলো চিহ্নিত করে এ বছর রমজান আসার আগে আগে কল্যাণকর সব নেক আমলগুলো করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
রমজানের পুরো সময়টি কোন কোন কাজে, কীভাবে ব্যয় হবে—তার একটি সম্ভাব্য রুটিন তৈরি করে নেওয়া। আগাম রুটিন থাকলে রমজানে চরম ব্যস্ততার মাঝেও নেক আমলসহ অন্য কাজগুলোও ইবাদতের মধ্যেই কেটে যাবে।
শাবান মাসের ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় চাঁদের অনুসন্ধান করা সুন্নত। বর্তমানে প্রায় সব মানুষই চাঁদ দেখা কমিটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার অনেকে মোবাইল বা রেডিও-টিভির সংবাদের অপেক্ষা করেন। এতে চাঁদ দেখা এবং দোয়া পড়ার সুন্নতটি থেকে বঞ্চিত হয় মুমিন-মুসলমান। তাই তা থেকে বেরিয়ে এসে চাঁদ অনুসন্ধান করার সুন্নতটি জীবিত করার সর্বাত্মক পূর্ব প্রস্তুতি রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় রমজানের চাঁদের অনুসন্ধান করতেন। এমনকি সাহাবিদের চাঁদ দেখতে বলতেন। রমজানের নতুন চাঁদ দেখলে প্রিয় নবী (সা.) কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করতেন।
তাই যারা রমজানের নতুন চাঁদ দেখবে তারা বিশ্বনবীর (সা.) সেই দোয়াটিও পড়বে। হাদিসে আছে, হজরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নতুন চাঁদ দেখতেন তখন বলতেন, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমানি ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি ওয়াত্তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা রাব্বুনা ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।’
অর্থ: আল্লাহ মহান, হে আল্লাহ! এ নতুন চাঁদকে আমাদের নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদয় কর। আর তুমি যা ভালোবাস এবং যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও, সেটাই আমাদের তৌফিক দাও। আল্লাহ তোমাদের এবং আমাদের প্রতিপালক।’ (জামে তিরমিজি: ৩৪৫১, মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৪২৮)
লেখক: মুফতি নিজাম উদ্দিন আল আদনান, মুহতামিম, জামিয়াতুল কোরআন, ঢাকা