ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত হানাফি আলেম, হাদিস বিশারদ ও আধ্যাত্মিক সাধক মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরি (রহ.) ছিলেন দেওবন্দি আন্দোলনের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম প্রাণপুরুষ। তাঁর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের সুবাস আজও সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
১৮৫২ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই জ্ঞানের প্রতি তাঁর প্রবল অনুরাগ ছিল।
শিক্ষাজীবন: ১৯ বছরেই পাণ্ডিত্য অর্জন
মাওলানা সাহারানপুরি (রহ.)-এর শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর নানা মাওলানা মামলুক আলীর কাছে।
- কোরআন ও প্রাথমিক শিক্ষা: নিজ গ্রামের মক্তবে কোরআন পাঠ শেষ করেন এবং চাচা মাওলানা আনসার আলীর কাছে আরবি ভাষা শেখেন।
- উচ্চশিক্ষা: তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে কিছুকাল পড়াশোনা করলেও সাহারানপুরের মাজাহিরুল উলুম থেকে দরসে নেজামির পুরো সিলেবাস শেষ করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৮৭১ সালে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
বর্ণাঢ্য অধ্যাপনা ও প্রশাসনিক জীবন
শিক্ষা সমাপনের পর তাঁর কর্মজীবন ছিল বহুমুখী ও সফল।
- ১. প্রাথমিক শিক্ষকতা: মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবির নির্দেশে বেঙ্গালুরুর একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ভূপাল, ভাওয়ালপুর ও বেরেলির বিভিন্ন মাদ্রাসায় অধ্যাপনা করেন।
- ২. দারুল উলুম দেওবন্দ: ১৮৯০ সালে শায়খ মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি (রহ.)-এর নির্দেশে দেওবন্দের দ্বিতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন।
- ৩. মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর: ১৮৯৫ সালে তিনি মাজাহিরুল উলুমের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের নাজিমে আলা (মহাসচিব) ও সারপারস্ত (পৃষ্ঠপোষক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টানা ৩১ বছর তিনি প্রতিষ্ঠানটির আমূল সংস্কার ও উন্নয়নে কাজ করেন।
ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলি
তাঁর আধ্যাত্মিক ও ইলমি উচ্চতা ছিল আকাশচুম্বী।
মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি (রহ.) তাঁর সম্পর্কে বলতেন—‘আমি যা, খলিল আহমাদও তা।’
হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কি (রহ.) এক পত্রে লিখেছিলেন—‘তুমি আমার সিলসিলার গৌরব। তোমার প্রতি আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’
জগদ্বিখ্যাত শিষ্যবৃন্দ
তাঁর কাছে সরাসরি হাদিস ও ফিকহ শিক্ষা নিয়েছেন এমন ছাত্রের সংখ্যা অগণিত। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:
- আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.)
- মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি (রহ.)
- মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভি (রহ.)
- মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি (রহ.)
অমর রচনাবলি
মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরি (রহ.) তাঁর ক্ষুরধার লেখার মাধ্যমে বাতিল ফেরকা ও ভ্রান্ত আকিদার বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো:
- বাজলুল মাজহুদ: এটি সুনানে আবু দাউদের বিশ্ববিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। হাদিস শাস্ত্রে এটি তাঁর অমর সৃষ্টি।
- আল বারাহিনুল কাতিআহ: বিদআতের অপনোদনে রচিত কালজয়ী গ্রন্থ।
- হিদায়াতুর রশিদ: শিয়া মতবাদের বিভ্রান্তি নিরসনে রচিত।
- মুতরিকাতুল কুররাসাহ: শিয়াদের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনে অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ।
মদিনায় হিজরত ও ইন্তেকাল
জীবনের শেষভাগে ১৯২৭ সালে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি সুনানে আবু দাউদের দরস প্রদান করতেন। ১৯২৭ সালের ১১ অক্টোবর এই মহান মুহাদ্দিস মদিনায় ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাকিতে হজরত উসমান জুন নুরাইন (রা.)-এর কবরের সন্নিকটে তাঁকে দাফন করা হয়।