হোম > ইসলাম

শবে মিরাজ: ঊর্ধ্বাকাশে নবীজি (সা.)-এর অলৌকিক যাত্রা

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ মানব ইতিহাসের একটি অলৌকিক ঘটনা। এই সফরে নবীজি (সা.) সপ্তম আকাশ পেরিয়ে আল্লাহ তাআলার এত নিকটবর্তী হয়েছিলেন, যেখানে কোনো ফেরেশতা এমনকি জিবরাইল (আ.)-ও যেতে পারেননি। নবীজি (সা.)-এর এই মহাযাত্রা উম্মতের জন্য আল্লাহর কুদরতের বিশেষ নিদর্শন হয়ে আছে।

মিরাজের প্রেক্ষাপট

মক্কা-জীবনের শেষ দিকে নবী করিম (সা.) একটা কঠিন সময় পার করছিলেন। একদিকে খাদিজা (রা.) ও আবু তালিবের ইন্তেকাল, অপর দিকে তাইয়েফবাসীর ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান—সব মিলিয়ে এ বছরটি ইতিহাসে আমুল হুজন বা শোকের বছর হিসেবে পরিচিত। এই সংকটময় সময়েই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে মিরাজের সম্মানজনক অধ্যায় দান করেন।

মিরাজ ও ইসরা অর্থ

মিরাজ শব্দটি আরবি। এর অর্থ ঊর্ধ্বে আরোহণ করা, ওপরে উঠে যাওয়া। পরিভাষায় সজ্ঞানে, সশরীরে হজরত জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.)-এর সঙ্গে বিশেষ বাহনে চড়ে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা এবং সেখান থেকে সপ্তম আকাশ পেরিয়ে আরশে আজিম পর্যন্ত ভ্রমণ, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ এবং জান্নাত-জাহান্নাম পরিভ্রমণ শেষে দুনিয়ায় ফিরে আসার অলৌকিক সফরকে মিরাজ বলে। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। এটি মিরাজের একটা অংশ। মিরাজের প্রথম ধাপ তথা মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে ইসরা বলা হয়।

কোরআনে মিরাজের বর্ণনা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইসরা ও মিরাজের আলোচনা করেছেন। ইসরা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয় তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ০১)

সুরা নাজমে মিরাজের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার নিকট।’ (সুরা নাজম: ১৩-১৪)। এ আয়াত প্রমাণ করে যে মিরাজ স্বপ্নের মাধ্যমে হয়নি, তা ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ দর্শন।

হাদিসে মিরাজের বিস্তারিত বর্ণনা

সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বাকাশ-যাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ—এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন। এমন সময় জিবরাইল (আ.) নবীজি (সা.)-এর কাছে আসেন, তাঁর বুক বিদীর্ণ করেন, জমজমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে দেন এবং ইমান ও হিকমত দ্বারা তা পূর্ণ করে আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন।

এরপর নবীজি (সা.)-কে বোরাক নামক একটি বিশেষ বাহন দেওয়া হয়। এর গতি ছিল বিস্ময়কর! একেকটি কদম পড়ছিল দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্তে! বোরাকে চড়েই নবীজি (সা.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছান। সেখানে তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং পূর্ববর্তী সকল নবীর ইমামতি করেন। এটি ছিল তাঁর সর্বজনীন নবুওয়তের প্রতীকী ঘোষণা।

বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে শুরু হয় মিরাজ তথা ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিটি আসমানে প্রবেশের আগে জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য সেখানকার দায়িত্বশীল ফেরেশতাদের থেকে অনুমতি গ্রহণ করেন। অনুমতি নেওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতে আসমানি শৃঙ্খলা ও আল্লাহর দরবারের মর্যাদা ফুটে ওঠে।

প্রতিটি আসমানে এক বা একাধিক নবীর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর সাক্ষাৎ হয়। প্রথম আসমানে মানবজাতির পিতা হজরত আদম (আ.), দ্বিতীয় আসমানে হজরত ইসা (আ.) ও হজরত ইয়াহইয়া (আ.), তৃতীয় আসমানে সৌন্দর্যের প্রতীক হজরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হজরত ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.), সপ্তম আসমানে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে নবীজি (সা.) সাক্ষাৎ করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) বায়তুল মামুরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। এটি আসমানি কাবা, যেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা ইবাদত করে।

এরপর নবীজি (সা.) সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান। এটি সৃষ্টিজগতের শেষ সীমান্তে অবস্থিত। এখানে এসে জিবরাইল (আ.) থেমে যান। বলেন, ‘আমি যদি এখান থেকে এক কদমও অগ্রসর হই, তবে জ্বলেপুড়ে ধ্বংস হয়ে যাব।’

এখান থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও ওপরে উঠতে থাকেন এবং এরপর আল্লাহ তাআলা নবীজিকে বিশেষ নৈকট্য দান করেন। প্রথমে উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। ফেরার পথে হজরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে নবীজি (সা.) বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যান। অবশেষে নামাজ কমতে কমতে পাঁচ ওয়াক্তে এসে দাঁড়ায়, তবে সওয়াব রয়ে যায় ৫০ ওয়াক্তের সমান। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, মিরাজের সফরে নবীজি (সা.) জান্নাতের নিয়ামত ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির কিছু দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেন। এক রাতেই নবীজি (সা.) সবকিছু ভ্রমণ করে পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন। (সহিহ বুখারি: ৩২০৭)

মিরাজের ঘটনায় আমাদের করণীয়

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজের পুরো ঘটনাটাই ইমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটি বিশ্বাস না করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইমান চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যে রাতে নবীজি (সা.) মিরাজে যান, সে রাতের গুরুত্ব নিয়ে মুসলমানদের কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। তবে এ ঘটনার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘদিন দুনিয়ায় জীবিত ছিলেন, এরপর শত বছর পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরামও দুনিয়ায় বেঁচে ছিলেন, এ দীর্ঘ সময়ে নবীজি (সা.) অথবা সাহাবায়ে কেরাম থেকে শবে মিরাজের বিশেষ কোনো আমল বর্ণিত হয়নি। শবে মিরাজ উদ্‌যাপন করারও কোনো বর্ণনা কোথাও পাওয়া যায় না। সুতরাং ২৭ রজবে বিশেষ কোনো ইবাদতকে দ্বীনের অংশ মনে করা সুন্নাহসম্মত নয়। এগুলো পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা সব ধরনের বিদয়াতি কাজকর্ম থেকে আমাদের হেফাজত করুন।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ, রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

জুমার নামাজ কত রাকাত, আদায়ের পদ্ধতি কী

শাবান মাস: ইবাদতের সুবাতাসে রমজানের প্রস্তুতি

মিরাজের বাহন বোরাক দেখতে কেমন ছিল?

ঐতিহাসিক মসজিদুল ফাসহের অজানা ইতিহাস

মৃত্যু এক অনিবার্য বাস্তবতা

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

তওবা: আল্লাহর রহমত ও বিপদ মুক্তির সুনিশ্চিত পথ

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

বেফাক পরীক্ষা: কওমি মাদ্রাসার বছর শেষের উৎসবমুখর পড়াশোনা