বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা সে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের এক মূর্ত প্রতীক। তবে সব দেশের পতাকার ভিড়ে সৌদি আরবের জাতীয় পতাকাটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত আবেগ ও মর্যাদার। গাঢ় সবুজ রঙের পটভূমিতে সাদা হরফে খচিত পবিত্র ‘কালেমা তাইয়্যেবা’ এবং তার নিচে একটি তরবারি—এই হলো সৌদি পতাকার মূল অবয়ব।
অনেকেই মনে করেন, এই পতাকার নকশা আধুনিক যুগের কোনো একক ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত। তবে সৌদি আরবের ইতিহাস ও রাজকীয় নথিপত্র বলছে ভিন্ন কথা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক বিবর্তন এবং ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই রূপ লাভ করেছে সৌদি পতাকা।
সৌদি আরবের পতাকায় কালেমা তাইয়্যেবা বা তাওহিদের বাণী যুক্ত হওয়ার ইতিহাসটি মূলত জড়িয়ে আছে আরব্য উপদ্বীপের ‘আস-সৌদ’ (সৌদ পরিবার) এবং প্রখ্যাত সংস্কারক শেখ মুহাম্মদ ইবনে আবদিল ওয়াহাবের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সঙ্গে। ১৮০০ শতাব্দীতে (১৭৪৪ সালে) দিরিয়া আমিরাত বা ‘প্রথম সৌদি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সৌদ পরিবারের শাসক ও যোদ্ধারা তাঁদের পতাকায় পবিত্র কালেমা ব্যবহার শুরু করেন।
সে সময় রাজকীয় এই রায়া বা ব্যানারটি তৈরি করা হতো সবুজ রঙের রেশম ও খাঁটি সিল্ক দিয়ে, যার ঠিক মাঝখানে সাদা হরফে লেখা থাকত—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ (لَا إِلٰهَ إِلَّا الله مُحَمَّدٌ رَسُولُ الله)। প্রথম ও দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্রের (নজদ আমিরাত) পুরো সময়ই এই ব্যানারটি যুদ্ধের ময়দানে এবং রাজ্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, অর্থাৎ ১৯০২ সালে আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা কিং আবদুল আজিজ বিন আবদুর রহমান আস-সৌদ যখন রিয়াদের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং ‘তৃতীয় সৌদি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন, তখন তিনি এই পতাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। তিনি কালেমার নিচে একটি সটান ‘আরবি তরবারি’ যুক্ত করার নির্দেশ দেন।
পতাকায় সৌদি রাজকীয় সংস্কৃতির প্রতীকী অর্থে—
কিং আবদুল আজিজের আমলে বিভিন্ন সময়ে পতাকার বাঁ পাশে (খুঁটির দিকে) একটি উল্লম্ব সাদা স্ট্রিপ বা কখনো দুটি তরবারি যুক্ত করার মতো কিছু ভিন্নতা দেখা যেত। ১৯৩৮ সালের দিকে পতাকাটি মূলত বর্তমান রূপ ধারণ করে, তবে সে সময় তরবারির ব্লেডটি কিছুটা বেশি বাঁকা ছিল এবং কালেমা ও তরবারি পতাকার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকত।
সৌদি আরবের ইতিহাস গবেষক ও কিং আবদুল আজিজ ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভস (দারাহ)-এর পক্ষ থেকে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা স্পষ্ট করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সৌদি পতাকার বর্তমান নকশাকার হলেন হাফিজ ওয়াহবা। কিন্তু ‘দারাহ’-এর তথ্যমতে, এটি একক কোনো ব্যক্তির নকশা নয়। প্রথম সৌদি রাষ্ট্র থেকে শুরু করে এটি ধাপে ধাপে বিবর্তিত হয়েছে।
পরে ১৯৩৭ সালে (১৩৫৬ হিজরি) সৌদি শুরা কাউন্সিলের ‘সিদ্ধান্ত নম্বর ৫০’ অনুযায়ী জাতীয় পতাকা, বাদশাহ ও যুবরাজের বিশেষ পতাকা এবং সামরিক বাহিনীর পতাকার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। কিং আবদুল আজিজ ১৯৩৭ সালের ১১ মার্চ (২৭ জিলহজ ১৩৫৫ হিজরি) এই নকশাটি অনুমোদন করেন। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করেই ২০২৩ সালে এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে প্রতিবছর ১১ মার্চ তারিখটিকে সৌদি আরবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় পতাকা দিবস’ (ইয়াউমুল আলাম) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সর্বশেষ ১৯৭৩ সালের ১৫ মার্চ বাদশাহ ফয়সালের শাসনামলে এই পতাকার অনুপাত, ক্যালিগ্রাফির শৈলী এবং তরবারির হাতলের অবস্থান সুনির্দিষ্ট ও পরিমার্জিত করে একটি চূড়ান্ত মানদণ্ড দেওয়া হয়, যা আজ অবধি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সৌদি আরবের পতাকাটি ৩: ২ অনুপাতে তৈরি একটি আয়তক্ষেত্র। এর মাঝখানের পবিত্র কালেমাটি আরবের অত্যন্ত নান্দনিক ও ধ্রুপদি ‘ছুলুছ’ ক্যালিগ্রাফি শৈলীতে লেখা।
পতাকাটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি তৈরি করা হয় ‘ডাবল-সাইডেড’ বা দ্বিমুখী কাপড়ে। অর্থাৎ এর সুনির্দিষ্টভাবে তৈরি সম্মুখভাগ ও বিপরীত ভাগ হুবহু একই রকম। যাতে যেকোনো দিক থেকেই তাকালে কালেমাটি ডান থেকে বামে সঠিকভাবে পড়া যায়। ক্যালিগ্রাফির লিখনশৈলীর গতিপথের সঙ্গে মিল রেখে তরবারির ধারালো অংশ এবং এর হাতলটিও উভয় পাশেই বাম দিক নির্দেশ করে (হাতলটি থাকে পতাকার খুঁটির দিকে বা ডান পাশে)। ২০২৩ সালে সৌদি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জারি করা ডিজিটাল নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডিজিটাল মিডিয়াতে ব্যবহারের জন্য এটি চারকোনা, গোল ও ডায়মন্ড—এই তিন আকারে নির্ধারিত এবং মূল ইমেজের ৭০ শতাংশজুড়ে কালেমাটি দৃশ্যমান থাকতে হবে।
পবিত্র কালেমা খচিত থাকায় সৌদি আরবের পতাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ পতাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পতাকার পবিত্রতা রক্ষায় সৌদি আইনে অত্যন্ত কঠোর কিছু বিধিমালা রয়েছে:
আল-ওয়াতান ডটকম অবলম্বনে