মানবসমাজে শ্রমের মর্যাদা অপরিসীম। ইসলাম এই শ্রমকে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। যাঁরা পরিশ্রম করে জীবিকা উপার্জন করেন, ইসলাম তাঁদের করেছে সম্মানিত ও মর্যাদাবান। শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেউ কখনো নিজের হাতের উপার্জন খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাদ্য ভক্ষণ করেনি।’ (সহিহ বুখারি: ২০৭২)
নবী-রাসুল, সাহাবি তাবেয়ি ও মুসলিম মনীষীদের জীবনে পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
নবী-রাসুলদের শ্রমজীবন
হজরত মুহাম্মদ (সা.)
নবী-রাসুলগণ ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁরা সবাই শারীরিক শ্রমের কাজ করেছেন। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যত নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, তাঁরা সবাই বকরি চরানোর কাজ করেছেন।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও কি বকরি চরিয়েছেন?’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি কয়েক কিরাতের (নির্দিষ্ট মুদ্রার পরিমাণ) বিনিময়ে মক্কাবাসীর বকরি চরিয়েছি।’ (সহিহ বুখারি: ২২৬২)। এ ছাড়া নবীজি (সা.) কৈশোরে চাচার সঙ্গে ব্যবসার উদ্দেশে সফর করেছেন। নবুওয়াতের পূর্বে খাদিজা (রা.)-এর পণ্য নিয়ে সিরিয়ার বাজারে ব্যবসা করেছেন।
হজরত আদম (আ.)
পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) কৃষক ছিলেন। তিনি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি তাঁতের কাজ করতেন বলেও কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়। হাফেজ শামসুদ্দিন জাহাবি রচিত ‘আত-তিব্বুন নববি’ কিতাবে বর্ণিত আছে—আদম (আ.)-এর ওপর যেসব ওহি অবতীর্ণ হয়েছিল, তার অধিকাংশই ছিল ভূমি আবাদ, কৃষিকাজ ও শিল্পসংক্রান্ত।
হজরত শিস (আ.)
মানবসভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় নবী হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেন হজরত শিস (আ.)। তিনি ছিলেন আদম (আ.)-এর তৃতীয় পুত্র। তিনিও কৃষিকাজ করতেন।
হজরত ইদরিস (আ.)
হজরত ইদরিস (আ.) ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত তৃতীয় নবী। তিনি কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। তিনিই প্রথম সেলাইবিদ্যা এবং লেখার জন্য কলম আবিষ্কার করেন।
হজরত নুহ (আ.)
হজরত নুহ (আ.) ছিলেন ইদরিস (আ.)-এর নাতি। কাঠমিস্ত্রির কাজ জানা ছিল তাঁর। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নৌকা তৈরির কলাকৌশল শিখিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি মহাপ্লাবন থেকে বাঁচতে সুবিশাল কিশতি বানিয়েছিলেন।
হজরত ইবরাহিম (আ.)
ইরাকের বাবেল শহরে ইবরাহিম (আ.)-এর জন্ম। ‘খলিলুল্লাহ’ তথা আল্লাহর বন্ধু উপাধিতে ভূষিত ছিলেন তিনি। তাঁর ছিল ব্যবসা, পশুপালন ও কৃষিকাজ। হজরত ইয়াকুব (আ.) ও হজরত শুয়াইব (আ.)-এর পেশাও ছিল এগুলো। ইবরাহিম-পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) পশুশিকারি ছিলেন। পিতাপুত্র দুজন রাজমিস্ত্রির কাজও জানতেন। উভয়ে মিলে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।
হজরত ইউসুফ (আ.)
পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্যের অধিকারী হজরত ইউসুফ (আ.) কেনান শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমান ফিলিস্তিনের একটি অংশ। বিভিন্ন ঘটনা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে মিসরের খাদ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে পারিশ্রমিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় অর্থ গ্রহণ করতেন।
হজরত মুসা (আ.)
খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রাচীন মিসরের রাজধানী পেন্টাটিউকে হজরত মুসা (আ.)-এর জন্ম। তিনি বনি ইসরাইলের কাছে প্রেরিত নবী ও রাসুল ছিলেন। পবিত্র কোরআনে তাঁর নাম ও ঘটনা সর্বাধিক বর্ণিত হয়েছে। তিনি হজরত শুয়াইব (আ.)-এর কন্যা সাফুরাহর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দীর্ঘ ১০ বছর শ্বশুরালয়ে পশু চরানোর কাজ করেন।
হজরত দাউদ (আ.)
হজরত দাউদ (আ.) যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন ক্ষমতা দিয়েছিলেন—তিনি স্পর্শ করলেই লোহা মোমের মতো গলে যেত। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ উপার্জনে জীবিকা নির্বাহ করতেন।’ (সহিহ বুখারি: ২০৭২)
হজরত জাকারিয়া (আ.)
জাকারিয়া (আ.) ছিলেন বনি ইসরাইলের একজন সম্মানিত নবী। তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে মারইয়াম (আ.)-এর তত্ত্বাবধান করতেন। পেশায় তিনি কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। (সহিহ মুসলিম: ২৩৭৯)
এভাবে সব নবী-রাসুলই কোনো না কোনো শ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।