ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট এবং মুসলিম সমাজ যখন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংকটে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এক আলোকবর্তিকা হাতে আবির্ভূত হন মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস, বিজ্ঞ ফকিহ এবং আধ্যাত্মিক রাহবার।
মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) ১৮২৯ সালে ভারতের গাঙ্গুহ শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই জ্ঞানের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন অনুরাগ। দিল্লির মাদ্রাসা রহিমিয়ায় তৎকালীন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মাওলানা মামলুক আলি নানুতুবি (রহ.)-এর সান্নিধ্য তাঁর মেধা ও ব্যক্তিত্বকে শাণিত করে।
তিনি কেবল কিতাবি আলেম ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক কর্মবীর। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে গ্রেপ্তার করলে তিনি অকুতোভয় চিত্তে জেল খাটেন। বন্দিজীবনেও তাঁর চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক কয়েদি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তওবা করেন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্য একদল নিঃস্বার্থ স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করেন।
ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষানীতির প্রতিবাদে এবং ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞান সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৮৬৬ সালে মাওলানা কাসেম নানুতুবি (রহ.)-এর সঙ্গে মিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দ। এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে ভারতবর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিম রেনেসাঁর কেন্দ্রে পরিণত হয়।
মাওলানা গাঙ্গুহি (রহ.) ছিলেন একজন প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক পীর। তাঁর সোহবত (সান্নিধ্য) সম্পর্কে হজরত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন, ‘হজরত গাঙ্গুহি (রহ.)-এর সান্নিধ্য এতই ফলপ্রসূ ছিল যে, কেউ যত দুশ্চিন্তা নিয়ে তাঁর দরবারে হাজির হতো, তাঁর সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তরে প্রশান্তি লাভ করত।’
তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যগণ (খলিফা) :
মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.)-এর ফিকহি প্রজ্ঞা ছিল অসামান্য। তাঁর রচিত ফতোয়া ও হাদিসের ব্যাখ্যাসমূহ আজও আলেম সমাজের কাছে প্রধান রেফারেন্স হিসেবে গণ্য হয়। তিনি শরিয়তের কঠোর অনুসরণের মাধ্যমে সমাজসংস্কারের ডাক দিয়েছিলেন।
১৯০২ সালে পবিত্র জুমার আজানের পর এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। গাঙ্গুহ শহরেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর রেখে যাওয়া ইলমি ও বৈপ্লবিক উত্তরাধিকার আজও উপমহাদেশীয় মুসলিমদের হৃদয়ে অম্লান।