যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে শুরু হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ। ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মেগা ইভেন্টটি মুসলিম বিশ্বের ফুটবল ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এবার রেকর্ডসংখ্যক ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ফুটবলের এই মহোৎসবে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে মুসলিম দেশগুলোর এই ব্যাপক উপস্থিতি বিশ্ব ফুটবলে মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানেরই প্রতিফলন।
কাতার বিশ্বকাপে (২০২২) প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা এবারও সবচেয়ে ফেবারিট মুসলিম দল হিসেবে মাঠে নামবে। প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) তারকা ফুলব্যাক আশরাফ হাকিমির নেতৃত্বাধীন দলটি ২০১৫ সালের ফিফা আরব কাপ জয় করেছে এবং সর্বশেষ আফ্রিকান নেশনস কাপে রানার্সআপ হয়েছে। সাতবার বিশ্বকাপ খেলা মরক্কো এখন যেকোনো টুর্নামেন্টের অন্যতম দাবিদার।
আফ্রিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দল এটি। ২০২২ ও ২০২৬ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ট্রফি জয়ী দলটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছিল ২০০২ সালে, যখন তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা ফুটবলারদের পাশাপাশি সৌদি আরবে খেলা তারকা সাদিও মানে এই দলের অন্যতম প্রধান শক্তি।
উল্লেখ্য, মাঠের খেলায় সেনেগাল আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা জিতলেও পরে নিয়মভঙ্গ ও ম্যাচ পরিত্যাগের অভিযোগে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল তাদের শিরোপা কেড়ে নেয়। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে মরক্কোকে নতুন আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘ দুই দশক পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছে তুরস্ক। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অধিকার করে বিশ্বকে চমকে দেওয়া দলটি এবার ইতালীয় কোচ ভিনসেনজো মন্তেল্লার অধীনে ইউরোপীয় প্লে-অফ পেরিয়ে মূল পর্বে এসেছে। আক্রমণভাগে কেরেম আকতুরকোলোর মতো তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে হাকান সুকুর ও রুস্তু রেচবারদের সেই সোনালি সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে চায় তারা।
২০১৪ সালের পর এই প্রথম ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফিরল আলজেরিয়া। ওই বছর ব্রাজিল বিশ্বকাপে তারা শেষ ১৬তে উঠে চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়েছিল। ২০১৯ সালে আলজেরিয়াকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জেতানো রিয়াদ মাহরেজ এখনো দলটির অন্যতম সেরা তারকা।
এটি ইরানের টানা চতুর্থ এবং সর্বমোট সপ্তম বিশ্বকাপ। এশিয়ার অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমির নেতৃত্বাধীন এই দলে আছেন আলিরেজা জাহানবখশ এবং এহসান হাজসাফির মতো অভিজ্ঞ তারকারা। তবে এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণটি ইরানের জন্য সহজ ছিল না। কারণ, বিশ্বকাপ শুরুর চার মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার শিকার হতে হয়েছে দেশটিকে, যা তাদের ঘরোয়া ফুটবলকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
বলকান অঞ্চলের এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে (প্রথমবার খেলেছিল ২০১৪ সালে)। প্লে-অফ শুটআউটে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে নাটকীয়ভাবে হারিয়ে তারা আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করে।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া লিভারপুল তারকা মোহাম্মদ সালাহর মিসর এবার দুর্দান্তভাবে ফিরে এসেছে। রেকর্ড সাতবারের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী দলটি এবার তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলবে।
এটি সৌদি আরবের সপ্তম বিশ্বকাপ। ১৯৯৪ সালে নিজেদের অভিষেক বিশ্বকাপে শেষ ১৬তে পৌঁছানো এবং ২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারানোর স্মৃতি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে টাটকা। ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে ফুটবল পরিকাঠামো ও ঘরোয়া লিগে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে চলেছে তারা।
কাতার ২০২২ সালে আয়োজক হিসেবে সরাসরি খেললেও এবারই প্রথম মূল বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। টানা দুবার এশিয়ান কাপ জেতা দলটির প্রাণভোমরা হলেন এশিয়ার বর্ষসেরা ফুটবলার আকরাম আফিফ এবং অলটাইম টপ স্কোরার আলমোয়েজ আলী।
২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ডেবিউ বা অভিষেক হতে যাচ্ছে জর্ডানের। ২০২৪ সালে প্রথমবার এশিয়ান কাপের ফাইনালে ওঠার পর এবার মূল বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা জর্ডানের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগে খেলা জর্ডানের প্রথম ফুটবলার মুসা আল-তামারি এই দলের মূল চালিকাশক্তি।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে ফিরল ইরাক। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে ২১টি ম্যাচ খেলে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম দীর্ঘতম বাছাইপর্বের মিশন পার করে এসেছে তারা। ২০০৭ সালের এশিয়ান কাপ জয়ী ইরাক এবার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় বা ড্রয়ের খোঁজে ইতিহাস গড়তে মরিয়া।
জর্ডানের মতো উজবেকিস্তানও এবার বিশ্বকাপে প্রথম অভিষেক ঘটিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে তারা খেলবে বিশ্বমঞ্চে। কয়েক দশক ধরে অল্পের জন্য সুযোগ হাতছাড়া হওয়া এই দলটির স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ২০২৫ সালে। দলের প্রধান তারকা ও অধিনায়ক এলডর শোমুরোদভ এবং তরুণ ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভ।
আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম দল তিউনিসিয়ার এটি সপ্তম বিশ্বকাপ। গত বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমকে দেওয়া দলটি এবার গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে নকআউট পর্বে যাওয়ার নতুন ইতিহাস গড়তে চায়।
তথ্যসূত্র: ফাইভ পিলারস ইউকে