কত চেষ্টা, কত মেহনত! কিন্তু মক্কার কাফিররা ইসলাম চিনতে রাজি নয়। চিরসুখের ছায়ায় আসতে রাজি নয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত মেনে নিলে তাদের ক্ষমতায় ভাটা পড়বে; তাই তাদের শেষ সিদ্ধান্ত—‘এবার মুহাম্মদকে মেরেই ফেলব।’
মায়ার নবী দেখলেন তাঁর ও তাঁর সাহাবিদের ওপর এই বর্বরদের অত্যাচার দিন দিন বেড়ে চলছে। শেষমেশ তিনি আল্লাহর নির্দেশে হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন। কোনো এক রাতের আঁধারে অশ্রুসজল নয়নে নিজের মাতৃভূমিকে বিদায় জানিয়ে পথ ধরলেন মদিনার। বিছানায় রেখে গেলেন সাহসী যুবক হজরত আলী (রা.)-কে। সঙ্গে বন্ধু আবু বকর (রা.)। বুকে জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার ব্যথা, চোখে নানা স্বপ্ন—ছুটে চলছেন নবীজি (সা.)।
এদিকে ওই রাতে মহানবীকে হত্যা করতে এসে কাফিররা দেখল, তিনি বাড়িতে নেই। তারা নানাভাবে জানতে পারল, তিনি হিজরত করছেন; চলে যাচ্ছেন দূর মদিনায়। তখন মক্কার অলিগলিতে তারা এক ভয়ংকর ঘোষণা ছড়িয়ে দিল—‘যে ব্যক্তি মুহাম্মদকে জীবিত বা মৃত ধরে আনতে পারবে, তাকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে ১০০ উন্নত জাতের উট।’
এই লোভনীয় পুরস্কার কি হাতছাড়া করার মানুষ ওই অভাগা কাফিররা? লোভে পড়ে অনেকে ছুটল মহানবী (সা.)-কে খুঁজে বের করতে। তাদের মধ্যে একজন ছিল সুরাকা ইবনে মালিক। সে ছিল মক্কার এক সাহসী ও প্রভাবশালী যুবক।
সুরাকার তর সইছে না। কালবিলম্ব না করে দ্রুতগামী ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। চোখে তার শত উটের স্বপ্ন—এই পুরস্কার পেলে জীবনে আর লাগে কী!
মরুর পথ ধরে ছুটে চলছে সুরাকা—‘মুহাম্মদকে খুঁজে পেতেই হবে।’ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলছে তার ঘোড়া। অবশেষে তার আশা পূরণ হলো। খুঁজতে খুঁজতে সে একসময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে পেয়ে গেল। তার মনে আনন্দ আর উত্তেজনার ঢেউ। আর কোনো বাধা নেই—আজ সে ১০০ উটের মালিক হবেই।
তার ঘোড়া ছুটছিল বিদ্যুতের বেগে। কিন্তু আল্লাহর কুদরত, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছাকাছি যেতেই হঠাৎ তার ঘোড়ার পা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। সুরাকা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও সামনে এগোনোর চেষ্টা করল। কিন্তু এবার তার ঘোড়ার পা বালুর মধ্যে দেবে গেল। যতবার সে চেষ্টা করে, ততবারই তার ঘোড়া বালুতে দেবে যেতে থাকে। এমন হলো কয়েকবার।
সুরাকার আর বোঝার বাকি রইল না যে এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সে অসহায় হয়ে নবীজি (সা.)-এর কাছে সাহায্য চাইল। সে বলল, ‘হে মুহাম্মদ, আপনি আমার খাবার-পানীয়, অস্ত্রশস্ত্র সব নিয়ে নিন। আমাকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিন। মুক্তি পেলে আমি ফিরে যাব। আপনার পেছনে আসা লোকদের দিগ্ভ্রান্ত করে অন্য পথে পাঠিয়ে দেব।’
নবী করিম (সা.) দয়ার সাগর। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তোমার কোনো আসবাবের দরকার নেই। তুমি শুধু আমাদের পিছু নেওয়া লোকদের অন্য পথে ঘুরিয়ে দেবে। এতটুকুই যথেষ্ট।’ এরপর নবীজি তার জন্য দোয়া করলেন। সুরাকা তৎক্ষণাৎ মুক্ত হয়ে গেল।
সুরাকা তো তখন অবাক—যে মানুষটির পিছু ধাওয়া করে সে এসেছে, সেই মানুষটিই তাকে সাহায্য করলেন। সে নবী করিম (সা.)-এর দিকে ফিরে বলল, ‘হে মুহাম্মদ, আমি নিশ্চিতভাবে জানি আপনি যে দ্বীনের আহ্বান করছেন, তা একদিন বিজয়ী হবে। আমাকে প্রতিশ্রুতি দিন, আমি যখন আপনার সাম্রাজ্যে যাব, আপনি আমাকে নিরাপত্তা ও সম্মান দেবেন।’
নবীজি (সা.) তাঁকে তখন লিখিতভাবে সেই প্রতিশ্রুতি দেন। সুরাকা ওয়াদামতো ফিরে গিয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর খোঁজে আসা কুরাইশদের অন্য পথে ঘুরিয়ে দিলেন।
সময় গড়িয়ে গেল। ইসলামের বিজয়ধ্বনি বাজতে থাকল চারদিকে। সময়ের পরিক্রমায় মক্কা বিজয় হলো। বিজয়ের দিনে সুরাকা সেই অঙ্গীকারপত্র নিয়ে নবীজি (সা.)-এর সামনে উপস্থিত হলো। নবীজি বললেন, ‘তুমি নিরাপদ, আজ প্রতিশ্রুতি পূরণ ও সদ্ব্যবহারের দিন।’
যে সুরাকা ১০০ উটের লোভে নবী করিম (সা.)-কে ধরতে এসেছিল, সেই সুরাকা তখন নবীজির হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করল। পড়ল কালিমা শাহাদাত। সুরাকা সেদিন নিজের নাম লিখিয়ে নিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের কাতারে। হয়ে গেল চিরস্মরণীয়।
তথ্যসূত্র: সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া