যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি যেন এক ঐতিহাসিক পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করেছেন, এবারের তুষারঝড় কোনো শীতকালীন সাধারণ দুর্যোগ নয়; এটি হতে পারে এই শহরের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ‘ব্লকবাস্টার ব্লিজার্ড’। সহজভাবে বলা যেতে পারে, তুষারঝড়ের মহাতাণ্ডব! পূর্বাভাস বলছে, নিউইয়র্কের কোথাও কোথাও এবার তুষারপাত ২৮ ইঞ্চি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নিউইয়র্কের সময় অনুযায়ী রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতেই ঘণ্টায় ২ থেকে ৪ ইঞ্চি হারে তুষার ঝরতে শুরু করেছে। ম্যানহাটান, ব্রুকলিন, কুইন্স, ব্রঙ্কস এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ড—এই পাঁচটি ‘বরো’ বা প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত নিউইয়র্ক। এই পাঁচ বরো জুড়েই গড়ে ১৪ ইঞ্চি তুষারপাতের পূর্বাভাস ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু এলাকায় এর দ্বিগুণ তুষারপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সতর্ক করে বলেছেন, ‘গত এক দশকে নিউইয়র্ক এমন ঝড়ের মুখোমুখি হয়নি। এটি শহরের ইতিহাসে শীর্ষ ১০ ভয়াবহ ঝড়ের একটি হতে পারে।’
আবহাওয়া সংস্থা অ্যাকুয়াওয়েদারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড্যান পাইডিনোভস্কি সতর্ক করেছেন, ভারী তুষারপাতের মধ্যে বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকের ঘটনাও ঘটতে পারে। এই ‘থান্ডার স্নো’ পরিস্থিতিতে রাস্তা পরিষ্কার রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। তুষার হবে ভেজা ও ভারী। ফলে এই তুষার সরানো কঠিন এবং শারীরিক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শহরের বাইরে লং আইল্যান্ড ও ট্রাই-স্টেট এলাকার বিভিন্ন অংশেও ব্যাপক তুষারপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নিউ জার্সির কিছু এলাকায় ইতিমধ্যে ৯ ইঞ্চি এবং লং আইল্যান্ডের সাফোক কাউন্টিতে ৮ ইঞ্চি তুষার জমেছে। স্থানীয় সময় অনুযায়ী, সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুর নাগাদ তুষারপাত থামার পূর্বাভাস থাকলেও এর আগেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তুষারপাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘণ্টায় ৬০ মাইল পর্যন্ত বেগের দমকা হাওয়া। লং আইল্যান্ড উপকূলে এই গতি আরও বেশি হতে পারে। এতে ‘হোয়াইটআউট’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে দৃষ্টিসীমা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। হোয়াইটআউট হলো এমন এক পরিস্থিতি—যখন তুষার ও বাতাস মিলে চারপাশ পুরোপুরি সাদা হয়ে যায়। অনেক সময় সামনের গাড়ি, রাস্তা বা ভবন—কোনো কিছুই দেখা যায় না। ফলে রাস্তা হারানোরও ভয় থাকে।
মেয়র মামদানি নাগরিকদের ভারী তুষার সরাতে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজা তুষার সরাতে গিয়ে হৃদ্রোগ ও পিঠের চোটের ঝুঁকি বাড়ে। প্রয়োজনে অন্যের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহও বিপর্যস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবহন খাতেও নেমে এসেছে অচলাবস্থা। সোমবার পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কুইন্সের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ ৭৪২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে লাগার্তিয়া ও নিউয়ার্ক লিবার্টি এয়ারপোর্টেও।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিউইয়র্কের সড়কে এখন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। শুধু জরুরি ও প্রয়োজনীয় যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি (এমটিএ) জানিয়েছে, সাবওয়ে সীমিত সেবায় চলবে, তবে লং আইল্যান্ড রেল রোড সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, চলতি মৌসুমে নিউইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্কে ইতিমধ্যে ২২ দশমিক ৩ ইঞ্চি তুষার রেকর্ড হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী ২৮ ইঞ্চি তুষার যোগ হলে মৌসুমি মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ ইঞ্চির বেশি; যা এই শহরের ইতিহাসে শীর্ষ ২০ মৌসুমের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে।
শুধু নিউইয়র্কই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মোট ১১টি অঙ্গরাজ্যে ‘ব্লিজার্ড’ বা মহাতাণ্ডব সতর্কতা জারি হয়েছে। ৪ কোটির বেশি মানুষ এই সতর্কবার্তার আওতায় রয়েছেন। এর মধ্যে নিউইয়র্কসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।