দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকা আজ শিশুদের জন্য এক ভয়াবহ নরকে পরিণত হয়েছে। আহত, পঙ্গু ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনি শিশুরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে—যেখানে শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্ন সবই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
গাজার শিশুদের নিয়ে এক প্রতিবেদনে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ওমর হালাওয়া নামে এক শিশুর কথা উল্লেখ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। ১৩ বছর বয়সী ওমর হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়। কারণ সে ভুলে গিয়েছিল—তার একটি পা নেই। তিন মাস আগে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে তার ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার মা ইয়াসমিন হালাওয়া বলেন, ‘ওকে এভাবে দেখতে আমাদের সবার খুব কষ্ট হয়।’
২০২৫ সালের ১ অক্টোবর, গাজার উত্তরের জাবালিয়া এলাকায় পানি আনতে গিয়ে গোলাবর্ষণের শিকার হয় ওমর হালাওয়া। তার সঙ্গে ছিল ১১ বছরের বোন লায়ান, ১৩ বছরের চাচাতো ভাই মোয়াজ ও বন্ধু মোহাম্মদ। পরিবারটি সেই সময়টিতে গাজার দক্ষিণে সরে যেতে পারেনি, কারণ যাতায়াতের খরচ ছিল ৬ হাজার শেকেল—যা তাদের পক্ষে অসম্ভব। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ১৫ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পানির তীব্র সংকটে শিশুরা সেদিন খুব ভোরে লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় গোলাবর্ষণ।
অস্ত্রোপচার করে ওমরের একটি পা কেটে ফেলতে হয়। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরই ওমর তার বন্ধু ও চাচাতো ভাইয়ের খোঁজ জানতে চেয়েছিল। দুঃখজনকভাবে তারা দুজনই ওই হামলায় নিহত হয়। পরিবারের সদস্যরা ওমরের কাটা পাটি তাদের তাঁবুর পাশেই কবর দিয়েছে। প্রতিদিন সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় ওমর। সে বলে, ‘আমার পা আমার আগেই বেহেশতে চলে গেছে।’
ওমরের পরিবার যুদ্ধের শুরু থেকেই মৃত্যু ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বোমাবর্ষণে ওমরের ছোট বোন লায়ান আহত হয়েছিল। ঘর ছাড়ার সময় সাদা কাপড় উঁচিয়ে ধরে তারা বের হয়েছিল সেদিন, যাতে ইসরায়েলি সেনারা গুলি না করে। পথে তারা তাদের আট বছর বয়সী এক আত্মীয়ের শিরশ্ছিন্ন মরদেহ দেখেছিল। সেই দৃশ্য আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। সামান্য শব্দেও তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
ওমর ও লায়ান গাজার সেই হাজারো শিশুর একজন, যারা এই যুদ্ধে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২০ হাজার শিশু। আহত হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার শিশু; অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গু। অন্তত ৩৯ হাজার শিশু এক বা উভয় অভিভাবককে হারিয়েছে—যা আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এতিম সংকট।
ইউনিসেফ বলছে, গাজা এখন শিশুদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গা। যুদ্ধবিরতির পরও সেখানে শিশু মৃত্যুর ঘটনা থামেনি। অপুষ্টি ও অনাহারে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ সংস্থা আইপিসি জানিয়েছে, ২০২৬ সালেও গাজার ৭৭ শতাংশ মানুষ চরম খাদ্যসংকটে থাকবে।