হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ট্রাম্পের ভাষণের পর বেড়েছে তেলের দাম, যুদ্ধ থামার আশা ক্ষীণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম একলাফে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের পর ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে এসেছে। গতকাল বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তাঁর এই ভাষণের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম একলাফে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষণের আগে ধারণা করা হয়েছিল, চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তিনি হয়তো ইতিবাচক কিছু বলবেন। যুদ্ধ বন্ধ না হোক, অন্তত তিনি এমন কিছু বলবেন, যা মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরাবে এবং সংকট নিরসনে উভয় পক্ষকে নমনীয় করবে। কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। উল্টো তাঁর ভাষণের পর দুই পক্ষেই উত্তেজনা বেড়েছে।

ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের হুঁশিয়ারি

ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না দিয়ে বরং হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত ভয়াবহ আঘাত হানব। আমরা তাদের পাথর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানি নেতারা যদি ওয়াশিংটনের শর্তে রাজি না হন, তবে ইরানের জ্বালানি ও তেল অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আরও ‘বিধ্বংসী ও ভয়াবহ’ হামলার সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, শত্রুদের ‘অনুশোচনা ও আত্মসমর্পণ’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।

দুই পক্ষের এমন বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আপাতত যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে অস্থিরতা ও ৩৫ দেশের বৈঠক

ইরানে হামলার পরে থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ট্রাম্প বলেছেন, যেসব দেশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল, তারা যেন নিজেরাই এটি ‘দখল’ করে নেয় এবং পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো জানিয়েছে, কেবল যুদ্ধবিরতি হলেই তারা এই অঞ্চলে নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে আসবে।

এই সংকট নিরসনে আজ বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের উদ্যোগে ৩৫টি দেশের একটি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এখন নিজেরাই হরমুজ প্রণালির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টে একটি বিল পর্যালোচনার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে শত্রুভাবাপন্ন দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ এবং অন্যদের কাছ থেকে টোল আদায়ের বিষয়টি আইনি রূপ পাবে বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র আব্বাস গুদারজি। এই বিল পাস হলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

ইরাক ছাড়ার নির্দেশ ও মানবিক বিপর্যয়

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের হামলার আশঙ্কায় এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

ইরান দাবি করেছে, ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় তাদের বড় স্টিল কারখানা এবং তেহরানের শতাব্দীপ্রাচীন ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ নামের চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে।

অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার কথা বলা হলেও পাল্টাপাল্টি হামলা চলতেই আছে এবং উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনীতি

গত সপ্তাহে যখন ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন তেলের দাম কমতে শুরু করেছিল, শেয়ারবাজার চাঙা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি আবার যখন হামলার হুমকি দিলেন, তখন বিশ্ববাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারে পৌঁছে গেছে।

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং আইইএ সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ‘অপ্রতিসম’ হবে।

সমাধান এখনো অনিশ্চিত

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমান ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তেহরানের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, তারা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায় না এবং কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও আলোচনা হচ্ছে না।

অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং জানিয়েছেন, ট্রাম্প নির্দিষ্ট কিছু শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারেন। পাকিস্তান সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিলেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সেখানে যোগ দেওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

এ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনার বিষয়টি নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কোনো পক্ষের বক্তব্যে কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে আর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত।

যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত ৭০ লাখ ইরানি

ইরানের অবরোধে হরমুজ প্রণালিতে আটকে আছে ২১৯০টি জাহাজ

ইরানে আগ্রাসন: যুদ্ধ বন্ধ হলেও মূল্য দিতে হবে বিশ্বকে

হরমুজ প্রণালি খুলতে যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত আরব আমিরাত

মার্কিন সেনাদের সঙ্গে রক্তের সমুদ্রে লড়তে চায় ইরান

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়নি ইরান—ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান আরাঘচির

বাগদাদে মার্কিন নারী সাংবাদিক অপহৃত

আরব আমিরাতে ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি নিহত

‘ওকে লাথি মেরে বের করে দিন’—নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে বললেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

এবার কাতার উপকূলে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা