অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, কৃষিজমি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অব্যাহত সহিংসতা ও উচ্ছেদের নেপথ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে একটি চরমপন্থী ও উগ্র-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী—হিলটপ ইয়ুথ। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অগোচরে ও অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থনে পশ্চিম তীরের পাহাড়ি এলাকায় অননুমোদিত ফাঁড়ি তৈরি করে ভূমির দখল নেওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানোই এদের মূল লক্ষ্য।
‘হিলটপ ইয়ুথ’ কোনো একক বা প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন নয়। এটি তরুণ ও উঠতি বয়সী চরমপন্থী ইহুদি যুবকদের একটি নেটওয়ার্ক। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন শান্তি আলোচনার আগে পশ্চিম তীরের ভূমির নিয়ন্ত্রণ নিতে বসতি স্থাপনকারীদের ‘পাহাড়ের চূড়াগুলো দখল’ করার আহ্বান জানান। এর পরপরই এই আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
প্রধানত ১৬ থেকে ২৬ বছর বয়সী তরুণ ও কিশোরদের নিয়ে এই গোষ্ঠী গঠিত। এদের অনেকেই জায়নবাদী ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্থায়ীভাবে পশ্চিম তীরে বসবাস শুরু করেন। এদের কোনো একক কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই।
কট্টর ও চরম ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী এই গোষ্ঠীর সদস্যরা মনে করে, বাইবেলে বর্ণিত পুরো ‘ইসরায়েল ভূখণ্ড’ কেবলই ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট। ফিলিস্তিনিদের যাতে কোনো ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা বা ভূখণ্ডগত অস্তিত্ব না থাকে, তা নিশ্চিত করতেই তারা পাহাড়ি অঞ্চল দখল করে থাকে।
হিলটপ ইয়ুথ হলো উগ্রপন্থী ‘ট্যাগ’ কৌশলের মূল চালিকাশক্তি। এই নীতি অনুযায়ী—ইসরায়েলি সরকার যদি কখনো অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে বাধা দেয় বা কোনো অননুমোদিত স্থাপনা উচ্ছেদ করে, তবে তার ‘মাশুল’ বা ‘দাম’ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের ওপর হিংসাত্মক হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়।
ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে সমন্বিত ও নৃশংস হামলার জন্য এই গ্রুপটি পরিচিত। এদের মূল অপকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে—ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, মসজিদ ও গির্জায় ভাঙচুর চালানো, জলপাই গাছ কেটে ফেলা এবং গবাদিপশু হত্যা করা। ফিলিস্তিনি কৃষক, রাখাল এমনকি ইসরায়েলি বামপন্থী শান্তি কর্মীদের ওপর পাথর, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা।
২০১৫ সালে পশ্চিম তীরের দুমা গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনার সঙ্গে এই গোষ্ঠী জড়িত ছিল, যেখানে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল ১৮ মাসের এক ফিলিস্তিনি শিশু ও তার বাবা-মাকে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পশ্চিম তীরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘হিলটপ ইয়ুথ’ এবং এর শীর্ষ নেতা মেইর এটিঙ্গার ও এলিশা ইয়েরেদের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর নিন্দা সত্ত্বেও এই গোষ্ঠীটি ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন জোটের কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর (যেমন—রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি) রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে থাকে। এ ছাড়া ‘সহিংসতা প্রতিরোধ’ ও কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তির নামে এসব বসতি প্রকল্পে সহায়তার জন্য ইসরায়েল সরকার ৫৫ লাখ শেকেল (প্রায় ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার) বরাদ্দ দিয়েছে।
হিলটপ ইয়ুথের সদস্য ও সমর্থকেরা মূলধারার রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছেন। এ লক্ষ্যে তারা ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দল লিকুদ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রবেশের উদ্যোগও নিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা