ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট এবার নতুন এক মোড় নিল। আজ মঙ্গলবার দুপুরে দলীয় বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার (সিগনেচার স্ক্যান্ডাল) অভিযোগে করা মামলার তদন্তে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনে তল্লাশি চালিয়েছে রাজ্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বাড়ি একই সঙ্গে তৃণমূলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় (৩০-বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট) হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্থানীয় সময় আজ দুপুর ১২টা নাগাদ সিআইডির কর্মকর্তারা কালীঘাট থানার পুলিশ ও একটি বিশাল নারী পুলিশ বাহিনী নিয়ে সেখানে হাজির হন। এর পাশাপাশি সিআইডির আরও দুটি দল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস ও তাঁর বাসভবনেও একযোগে তল্লাশি শুরু করে।
সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের জন্য স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া এক প্রস্তাবে তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ ওঠে। এই মামলায় এর আগে সিআইডির পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক সিআইডি কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের পাঠানো নোটিশের জবাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, বিধায়কদের স্বাক্ষর ৩০-বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়েই সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাঁর সেই বয়ানের ওপর ভিত্তি করেই আজ আমরা এখানে তল্লাশি চালাতে এসেছি।’
এদিকে সিআইডি যখন হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনেই ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। জানা গেছে, তৃণমূলের প্রবীণ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য সুভাশিষ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে দলীয় কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা সিআইডিকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। সুভাশিষ চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতিতে আমরা সিআইডিকে ভেতরে ঢুকতে দিতে পারি না। তাঁরা ফিরে আসুক, তারপর তল্লাশি হবে।’
এ নিয়ে সিআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়। সিআইডি অভিযোগ করে, তাঁরা তদন্তে বাধা দিচ্ছেন। পরে বিকেলের দিকে সিআইডি আরও কিছু পুলিশ সদস্য নিয়ে আসে। এর পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কলকাতা পুলিশের সদস্যদের নির্দেশ দেয় যেন তদন্তে কোনো বাধা না দেওয়া হয়। এরপর প্রতিরোধের মুখে সার্চ ওয়ারেন্ট দেখিয়ে সিআইডি কর্মকর্তারা সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি তথা কার্যালয়ে প্রবেশ করেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র তল্লাশি ও যাচাই শুরু করেন।
এই রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে স্পিকারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল, যাতে প্রায় ৭০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু দলের দুই বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন, এই রেজল্যুশনটি সম্পূর্ণ ‘বানোয়াট ও জাল’। তাঁরা দাবি করেন, ৭০টি স্বাক্ষরের মধ্যে অন্তত ১৪টি স্বাক্ষর ‘ব্লক লেটারে’ (বড় হাতের অক্ষরে) করা, যা স্পষ্টতই জালিয়াতি।
এই অভিযোগের পর কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় একটি এফআইআর করা হয়, যার তদন্তভার পরে সিআইডির হাতে ন্যস্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকে এই দুই বিধায়কের নাম জনসমক্ষে প্রকাশের কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৃণমূল তাঁদের দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কার করেছিল। তবে এই ঘটনার পর তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন জানান। পরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্পিকারের স্বীকৃতি লাভ করেন।