ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশে চীনা সেনাদের সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর একাধিক অমীমাংসিত মুখোমুখি অবস্থান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন চীন সীমান্তের দায়িত্বে থাকা ভারতের আধা সামরিক বাহিনী ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর। প্রায় ছয় বছর আগে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কঠোর অবস্থানের ভাবমূর্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে কাপুর বলেন, অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান এখনো অব্যাহত রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের প্রায় চার মাস আগে ওই অঞ্চলের স্থানীয় নাগরিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছিল, চীনা সেনারা ক্রমেই ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করছেন এবং ভারতীয় সেনাদের নিয়মিত টহল দেওয়ার কয়েকটি এলাকায় যেতে বাধা দিচ্ছেন।
গত মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর প্রথমবারের মতো নয়াদিল্লি সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। সম্মেলনের ফাঁকে মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ থেকেও ভারত ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও দুই দেশের ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ অচিহ্নিত সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি।
অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম আপার সুবানসিরি এলাকায় বর্তমানে মুখোমুখি অবস্থানের খবর পাওয়া গেছে। ১৯৫৯ সালের আগস্টে স্বাধীন ভারতের সঙ্গে চীনের প্রথম সীমান্ত সংঘর্ষও এই অঞ্চলে ঘটেছিল। এতে অন্তত দুই ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন।
ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের শিকড় রয়েছে ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে নির্ধারিত ম্যাকমোহন রেখায়। সে সময় তিব্বত চীনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত এই রেখাকে দুই দেশের সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর চীন তা প্রত্যাখ্যান করে। বেইজিং পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে অভিহিত করে। অন্যদিকে, বিতর্কিত কাশ্মীরের আকসাই চিন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
১৯৬২ সালে দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে (এলএসি) কার্যত সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে সম্মত হলেও প্রকৃত সীমান্তের অবস্থান নিয়ে বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে চীনও। পরবর্তী সময়ে স্যাটেলাইট চিত্র ও বিভিন্ন নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যে বিতর্কিত কিছু এলাকায় চীনের নিয়ন্ত্রণ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ভারত সরকার ভূখণ্ড হারানোর অভিযোগ স্বীকার করেনি।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ ডোন্থি মনে করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির উদ্যোগের মধ্যেও সীমান্ত উত্তেজনা চীনের চাপ প্রয়োগের কৌশল হতে পারে। তাঁর মতে, সীমান্তের সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারিত না থাকায় মাঝেমধ্যেই এ ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীন নীতি নিয়ে মোদি সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধী দলগুলো। বিশেষ করে, চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের বক্তব্যে অসংগতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
সংঘর্ষের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, চীনা বাহিনী গালওয়ান উপত্যকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ভারতীয় অংশে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করেছিল এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপের কারণে সংঘর্ষ ঘটে। কিন্তু এর দুই দিন পর মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ভারতের ভূখণ্ডে কেউ প্রবেশ করেনি এবং কেউ সেখানে অবস্থানও করছে না। এ নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়ে সরকার।
অরুণাচল প্রদেশের কংগ্রেস নেতা বসিরাম সিরাম দাবি করেছেন, চীনা সেনারা আপার সুবানসিরি এলাকায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থান করছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, চীনা সেনাদের পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যাচ্ছে আর ভারতীয় সেনারা রয়েছেন নিচের দিকে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, চীনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহলব্যবস্থা থেকে সরে এলে সীমান্ত পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বিঘ্নিত হয়। তবে বর্তমান মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।
২০১২ সাল থেকে সীমান্ত বিরোধ নিয়ন্ত্রণে ভারত ও চীন সামরিক যোগাযোগের পাশাপাশি পরামর্শ ও সমন্বয়ের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। গত ৬ আগস্ট দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বরে অরুণাচল প্রদেশে প্রথমবারের মতো কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকও হয়।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক অধ্যাপক বিআর দীপকের মতে, এসব উদ্যোগ উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করলেও সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া সীমান্তে যেকোনো সমঝোতা ভঙ্গুর থেকে যেতে পারে।
আইটিবিপির প্রধান কাপুরও সতর্ক করে বলেছেন, সীমান্তে চীনের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে চীনা বাহিনীর মোকাবিলা করা ভারতের জন্য কঠিন হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে।