পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসে (টিএমসি) ভাঙনের দ্বিতীয় দিনেই বিদ্রোহী শিবিরের ভেতরে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা (এলওপি) হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক বিদ্রোহী বিধায়ক আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের দাবি, বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ার সময় তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন এবং ঋতব্রতকে বিকল্প নেতা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দ্য টেলিগ্রাফকে হাওড়ার পাঁচলার বিধায়ক গুলশান মল্লিক বলেন, ‘আমরা যখন (বুধবারের চিঠিতে) সই করেছি, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমাদের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবেই সই করেছি।’ তবে তাঁরা ব্যাখ্যা করেননি, কীভাবে তাঁরা আশা করেছিলেন যে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকেই লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেবেন।
সূত্রগুলোর দাবি, বিদ্রোহী বিধায়কদের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের পর্দার আড়ালের চাপ কাজ করেছে। গত বুধবার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কাছে জমা দেওয়া এক চিঠিতে ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা করার আবেদন জানান। গুলশান মল্লিকসহ বর্তমান আপত্তিকারী বিধায়কদের অনেকেই সেই চিঠিতে সই করেছিলেন।
এই পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির এক প্রবীণ নেতা মন্তব্য করেন, ‘আমাদের বাঙালি উদ্ভাবনশক্তিকে সম্মান দিন। একে ‘শিন্ধে মডেল’ বা ‘চাড্ডা মডেল’ বলবেন না, এটা হলো ‘বন্দ্যোপাধ্যায় মডেল’।’
পরে ৪৭ বছর বয়সী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই গোষ্ঠীর ‘প্রধান পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকবেন। কিন্তু গুলশান মল্লিক বলেন, ‘নেতা এক বিষয়, আর সর্বোচ্চ নেতা এক বিসয়। যাকে সবাই অভিভাবক বলে। ‘প্রধান পরামর্শদাতা’ মানে বাইরের একজন, যিনি উপরিভাগে সহায়তা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যদি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে রাখা না হয়, তাহলে আমাদের পুরো বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।’ এর অর্থ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আপনাদেরই বুঝে নিতে হবে।’
সূত্র জানায়, কোচবিহারের সিতাইয়ের বিধায়ক সঙ্গীতা রায়ও পুনর্বিবেচনাকারীদের মধ্যে রয়েছেন। তবে বিধানসভা স্পিকার রথীন্দ্র বোস ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে ঋতব্রতকে বহিষ্কার করা ‘সম্পূর্ণ বেআইনি’ ছিল, কারণ তাঁকে কোনো শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়নি। দিল্লিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া ঋতব্রতের পক্ষে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিধায়কও ছিলেন। তাই সব দিক বিবেচনা করেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
বিদ্রোহী শিবিরের একাংশের আশঙ্কা, ‘অভ্যাসগত দলবদলকারী’ হিসেবে পরিচিত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় গোষ্ঠীটিকে বিজেপির খুব কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেন। দক্ষিণবঙ্গের এক বিদ্রোহী বিধায়ক—যিনি স্পিকারের কাছে দেওয়া চিঠিতে সই করেছিলেন—বলেন, ‘হঠাৎ করে উনিই কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন? এটা তো ছিল একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা...।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী জোটের মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে কি তাঁকে ভাবা হবে? যদি তাই হয়, তাহলে আমরা সেই ভবিষ্যতের অংশ নই। আমরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র আচরণ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম, কোনো গেরুয়া-সমর্থিত ঋতব্রতের অধীনে যেতে নয়।’
তবে ঋতব্রত-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তিনি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তাঁদের মতে, এটি একটি সাময়িক এবং পূর্বানুমেয় সমস্যা, যা দ্রুত মিটে যাবে। ঋতব্রতের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে জেতা সম্ভব নয়। কয়েক দিন তাঁরা এসব কথা বলবেন, তারপর অনিবার্যভাবেই সারিতে ফিরে আসবেন। তাঁরা জানেন, তাঁদের সামনে কী ধরনের বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।’
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কৌশলবিদরা বিদ্রোহী শিবিরে ভাঙন ধরাতে সক্রিয় হয়েছেন। তাঁরা বিদ্রোহী শিবিরের প্রথমবারের নির্বাচিত এবং গ্রামীণ এলাকার, বিশেষ করে মুসলিম বিধায়কদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন। সূত্র জানায়, এসব বিধায়ককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে স্পিকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তৃণমূল সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি তাঁদের নিজ এলাকায় ফিরে গেলে সম্ভাব্য জনরোষের বিষয়টিও তুলে ধরা হচ্ছে।
তৃণমূলের এক অভ্যন্তরীণ সূত্র বলেন, ‘তিনি (মমতা) ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। আবেগঘন আবেদন জানিয়েছেন, আবার সতর্কও করেছেন যে তিনি যখন বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাবেন এবং সফল হবেন, তখন তাঁদের কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।’
তবে প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে এই রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা এবং বঙ্গীয় নবজাগরণের ব্যক্তিত্বদের ছবি ও মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পাশাপাশি কালীঘাট মন্দিরে প্রার্থনা করেন।