ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয় এবং লোকসভায় সংসদীয় দলে নজিরবিহীন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে এবার কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে তৎপর হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)।
কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠকের পরদিনই আজ বুধবার সকালে দিল্লির ১০ জনপথে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে পড়ে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরেই ঘুরে দাঁড়াতে চাচ্ছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
তৃণমূল দলীয় সূত্রের বরাতে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাহুল গান্ধী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে এই বৈঠক চলে। তৃণমূলের একটি সূত্র এটিকে অত্যন্ত ‘ইতিবাচক বৈঠক’ বলে দাবি করেছে।
বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, বৈঠকে মূলত বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’কে (INDIA) জাতীয় স্তরে আরও শক্তিশালী করা এবং মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে কীভাবে বিজেপি-বিরোধী দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা যায়, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
তবে সূত্রটির দাবি, জোটের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়েও দুই নেতার মধ্যে কথা হয়েছে।
রাহুল ও অভিষেকের এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষ চলছে।
সম্প্রতি তৃণমূলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ দলটির বর্ষীয়ান নেত্রী কাকলী ঘোষ দস্তিদার ও যুবনেত্রী সায়নী ঘোষের নেতৃত্বে লোকসভার স্পিকারের কাছে আলাদা ব্লক গঠনের আবেদন জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী দিল্লির শাসকজোট বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সকে (এনডিএ) সমর্থন জানাতে পারে।
এই চরম রাজনৈতিক দুর্যোগের মুখে সোনিয়া ও রাহুলের সঙ্গে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই ধারাবাহিক বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের মতে, দল ভাঙার আশঙ্কায় তৃণমূল এখন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় শক্তির সমর্থন নিশ্চিত করতে মরিয়া।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে আদর্শগত ও কৌশলগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে দল ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ ২৮ বছর পর সেই মমতাই আজ তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও দল বাঁচাতে পুনরায় সোনিয়া গান্ধীর শরণাপন্ন হলেন—যাকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের ঐতিহাসিক নাটকীয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কংগ্রেসে থাকাকালে রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সুবাদে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বরাবরই ব্যক্তিগত স্তরে বেশ উষ্ণ। জাতীয় রাজনীতিতে রাহুল গান্ধীর কিছু কৌশল বা বক্তব্যের সঙ্গে অতীতে একাধিকবার তৃণমূল নেত্রীর মতপার্থক্য তৈরি হলেও তিনি কখনোই প্রকাশ্যে সোনিয়ার সমালোচনা করেননি।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ভরাডুবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
দিল্লিতে যখন রাজনৈতিক সুরক্ষার খোঁজে তৃণমূল নেতৃত্ব কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কলকাতায় তৃণমূলের ওপর চাপ বজায় রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিপক্ষ। গত সোমবার যখন বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে মমতা ও সোনিয়া গান্ধী পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা বিনিময় করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই কলকাতায় মমতার বাড়ির পাশের তৃণমূল কার্যালয়ে সই জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশি তল্লাশি চালানো হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্য রাজনীতিতে কোণঠাসা হওয়া ও দলের ভেতরে একের পর এক সাংসদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক আধিপত্যের রাজনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। এখন সোনিয়া-রাহুলের হাত ধরে দিল্লির রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা কতটা বজায় রাখতে পারেন তৃণমূল নেত্রী, সেটাই এখন দেখার বিষয়।