ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা পর এবার ভয়াবহ সংকটে পড়েছে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। আজ বুধবার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে দলের মূল কমিটিসহ সহযোগী সংগঠনের সব কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
আজ বিকেলে তৃণমূল কংগ্রেসের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসসহ এর সব সহযোগী সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করা হলো।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই নাটকীয় সিদ্ধান্ত আসে দলটির ভেতর প্রকাশ্য বিদ্রোহের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে। এর আগে আজ তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত অন্তত ৫৮ জন বিধায়ক (এমএলএ) দলের অফিসিয়াল সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেন।
অথচ দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত সোমবারই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরেক নতুন বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল তৃণমূল। বহিষ্কৃত হওয়ার আগে ঋতব্রত তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের (আইএনটিটিইউসি) প্রধান ছিলেন। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকে এমনিতেই তৃণমূলের অবস্থা বেগতিক ছিল (দলটি এবার মাত্র ৮০টি আসন পেয়েছে)। এরই মধ্যে দলের একাংশের বিধায়কদের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ দলটিকে আরও সংকটে ফেলে দিয়েছে।
এদিকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কেরা আজ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর করা একটি সমর্থনপত্র স্পিকারের কাছে জমা দিয়ে ঋতব্রতকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তাঁরা সন্দীপন সাহা, শিউলি সাহা ও জাভেদ খানকে উপ-বিরোধীদলীয় নেতা এবং রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জামানকে দলের চিফ হুইপ হিসেবে মনোনীত করেন।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, আইনগতভাবে এই পদক্ষেপের কোনো ভিত্তি নেই। বিধায়কদের এমন চিঠি দেওয়ার কোনো একক এখতিয়ার নেই। বিধানসভার স্পিকারের কাছে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো চিঠিটিই একমাত্র বৈধ চিঠি।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকার রথীন্দ্র বোসকে চিঠি দিয়ে প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা, অসীমা পাত্র ও নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে উপনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে চিফ হুইপ করার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্পিকারের কার্যালয় থেকে সেই চিঠি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল বলে দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। পরে তা ই-মেইল ও রেজিস্টার্ড পোস্টের মাধ্যমে পাঠানো হয়।
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বিদ্রোহীদের সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি এই বিদ্রোহী বিধায়কদের দলের অফিসিয়াল নাম নিয়ে কোনো আপত্তি থাকত, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে হওয়া দলীয় বৈঠকে তাঁরা কেন এই কথা তোলেননি?’
দলের ভেতরের এই ব্যাপক ভাঙনের পর তৃণমূল জানিয়েছে, তারা এখন দলের প্রতিটি স্তরে আত্মবিশ্লেষণ, কাজের পর্যালোচনা ও নেতা-কর্মীদের সাংগঠনিক দক্ষতা মূল্যায়ন করবে। এই পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে মূল দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নতুন কাঠামো তৈরি করে যথাসময়ে কমিটি ঘোষণা করা হবে। নতুন উদ্যমে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও এক্স পোস্টে জানানো হয়।
এদিকে দলের এমন সংকটের মধ্যেই আগামী সপ্তাহে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি সফরে যাচ্ছেন। সেখানে তাঁরা বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়ার বৈঠকে যোগ দেবেন এবং সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের কৌশল ও বিজেপির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন।