পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রথমবারের মতো শিলিগুড়িতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করতে যাচ্ছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শাখা সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে নিরাপত্তা বাহিনী, রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যও বৈঠকে যোগ দিতে পারেন।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা শিলিগুড়ি করিডর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝখানে অবস্থিত প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরের সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার। এছাড়া এটি ভারত-চীন-ভুটান ত্রিসীমানার খুব কাছাকাছি হওয়ায় এর নিরাপত্তা বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।
রাজ্য পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের অগ্রগতি, বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডর সংলগ্ন সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করবেন অমিত শাহ। পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে রাজ্য সরকার, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনাও দিতে পারেন তিনি।
যদিও দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে, তবে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত কয়েক বছরে কেন্দ্র সরকার এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও চীনকে ঘিরে সাম্প্রতিক কয়েকটি ভূরাজনৈতিক ঘটনা কেন্দ্রকে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাটের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে। এই বিমানঘাঁটিটি শিলিগুড়ি করিডর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এ ছাড়া, সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে শিলিগুড়ি করিডর অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তিস্তা নদীর অববাহিকার কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। এক পর্যবেক্ষকের ভাষ্য, শিলিগুড়ি করিডরের মতো কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এলাকার এত কাছে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে সীমান্তের একাধিক অংশে বেড়া নির্মাণ সম্ভব হয়নি, কারণ রাজ্য সরকার সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) প্রয়োজনীয় জমি দেয়নি। তবে মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফের কাছে এক হাজার একর জমি হস্তান্তর করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র সরকার শুধু নিরাপত্তা নয়, শিলিগুড়ি করিডরে যোগাযোগ অবকাঠামোও দ্রুত উন্নত করছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত লজিস্টিক সহায়তা ও সেনা চলাচল নিশ্চিত করা যায়। এর অংশ হিসেবে রেল মন্ত্রণালয় করিডরের একটি অংশে ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প ঘোষণা করেছে এবং অতিরিক্ত রেললাইন নির্মাণের কাজও চলছে। বাগডোগরা বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি রাফাল স্কোয়াড্রন থাকা হাসিমারা বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজও চলছে।
শুক্রবার শিলিগুড়িতে পৌঁছে শহরের উপকণ্ঠ কদমতলায় বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে রাত্রিযাপন করবেন অমিত শাহ। আগামীকাল শনিবার তিনি বিএসএফের একটি সীমান্ত চৌকি (বর্ডার আউটপোস্ট) পরিদর্শন করবেন এবং সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এ সময় তিনি কয়েকটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন এবং আরও কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধন করবেন।
এরপর উত্তরকন্যায় তিনি একাধিক বৈঠক করবেন। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নতুন ‘গুন্ডা আইন’ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও একটি বৈঠক রয়েছে। এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, নিরাপত্তা সংস্থা, পুলিশ ও প্রশাসনের অংশগ্রহণে এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে শিলিগুড়িতে এমন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়নি। তাঁর মতে, এটি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে কেন্দ্রের গুরুত্বের প্রতিফলন। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় রাজ্য সরকারও আগের তৃণমূল সরকারের তুলনায় কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করছে।
তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া