সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক ও দলটির প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। শুক্রবার (৮ মে) বিজেপির ২০৭ জন নবনির্বাচিত বিধায়কের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে বিধানসভার সংসদীয় দলনেতা নির্বাচিত করা হয়। সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে শুভেন্দুই হতে যাচ্ছেন রাজ্যের প্রথম গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী। আগামীকাল শনিবার (৯ মে) কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হবে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান।
যেকোনো রাজ্যে নির্বাচনের পর দলের পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের পাঠায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রধান পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। তাঁর সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। তাঁদের উপস্থিতিতে আজ বিকেলে নিউ টাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে নবনির্বাচিত বিধায়কদের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। বিধায়কদের সমর্থনপত্র নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল আরএন রবির কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন।
ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর থেকে মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে শুভেন্দু অধিকারীর নাম সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। কারণ, হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাঁর টানা দুবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার কৃতিত্বকে দেখছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে হারিয়েছিলেন ‘জায়ান্ট কিলার’ শুভেন্দু। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুক হিসেবে পরিচিত ‘ভবানীপুর’ কেন্দ্রে সরাসরি মমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তিনি। ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম—উভয় আসন থেকেই এবার লড়েন শুভেন্দু। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী দলনেতা ও মুখ্যমন্ত্রীর এমন সম্মুখসমর এবং সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ভবানীপুরের পাশাপাশি নন্দীগ্রাম আসনেও শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করকে প্রায় ১০ হাজার ভোটে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন। এই দ্বিমুখী ও দাপুটে বিজয়ের পর বিজেপির অন্দরেই তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
সাধারণত নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে বড় ধরনের ‘চমক’ দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। অতীতে অনেক রাজ্যে এমন ব্যক্তিকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে, যাঁর নাম আলোচনায় ছিল না। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেই পথে হাঁটেনি। মমতাকে তাঁর নিজের মাঠে হারিয়ে শুভেন্দু নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রমাণ করায় তাঁকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ ছিল না। তা ছাড়া এত বড় ঐতিহাসিক জয়ের পর দলের মধ্যে কোনো ধরনের অসন্তোষ বা ঝুঁকি নিতে চায়নি দলের হাইকমান্ড।
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০৭টি আসনে বিশাল জয় পেয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে বিদায়ী শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন এবং বাম-কংগ্রেস জোট ও অন্যরা পেয়েছে ৬টি আসন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ফালতা আসনে ২১ মে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে শনিবারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে কলকাতায় আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আজ শুক্রবার সকালে কলকাতায় পৌঁছান এবং দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে পূজা দেন। দুই শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণকে ঘিরে এখন সাজ সাজ রব রাজ্য বিজেপির অন্দরে।
সূত্র: আনন্দবাজার