ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান এমএম নারাভানের স্মৃতিকথামূলক প্রকাশিতব্য বই ‘ফোর স্টারস অব ডেসটিনি’ নিয়ে দেশটিতে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশক প্রতিষ্ঠান বইটি বাজারে ছাড়ার আগেই, এর পান্ডুলিপির কপি বা অনুলিপি ছড়িয়ে পড়ার পর এই বিতর্ক তৈরি হয়। এমনকি বিষয়টি ভারতের পার্লামেন্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, বইটির প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া এক স্পষ্টিকরণ বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক সেনাপ্রধান এমএম নারাভানের স্মৃতিকথা ‘ফোর স্টারস অব ডেসটিনি’র একমাত্র প্রকাশনার অধিকার তাদেরই। একই সঙ্গে তারা বলেছে, বইটি এখনো কোনো রূপেই প্রকাশিত হয়নি।
অননুমোদিতভাবে বইটির পান্ডুলিপির কপি ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এবং সেই বিতর্ক পার্লামেন্ট পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটেই এই বক্তব্য দিল প্রকাশনা সংস্থাটি। দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যে এ ঘটনায় একটি এফআইআর নথিভুক্ত করেছে। তারা বলছে, অনুমোদন না পাওয়া একটি প্রকাশনা থেকে অবৈধভাবে তথ্য বা কপি ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া জানায়, বইটির ডিজিটাল ও অন্যান্য ফরম্যাটে কপি ছড়িয়ে পড়ার খবর প্রকাশিত হওয়ায় তারা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চায়। এতে বলা হয়, ‘পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া স্পষ্ট করে জানাতে চায় যে, সাবেক ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানের স্মৃতিকথা ফোর স্টারস অব ডেসটিনি বইটির একমাত্র প্রকাশনার অধিকার আমাদের। আমরা পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছি, বইটি এখনো প্রকাশনায় যায়নি।’
প্রকাশনা সংস্থাটি আরও জানায়, তাদের পক্ষ থেকে বইটির কোনো কপিই—ছাপা বা ডিজিটাল কোনো রূপে—প্রকাশ, বিতরণ, বিক্রি বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। তারা সতর্ক করে বলেছে, বর্তমানে যদি বইটির কোনো পূর্ণ বা আংশিক সংস্করণ কোনো ফরম্যাটে ঘুরে বেড়ায়, তবে তা সরাসরি কপিরাইট লঙ্ঘনের শামিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বর্তমানে যদি বইটির কোনো কপি—সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে—ছাপা, ডিজিটাল, পিডিএফ বা অন্য যেকোনো ফরম্যাটে, অনলাইন বা অফলাইনে, যেকোনো প্ল্যাটফর্মে থাকে, তবে তা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার কপিরাইট লঙ্ঘন। এসব অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’ তারা জানিয়েছে, এই অননুমোদিত বিতরণের বিরুদ্ধে তারা আইনি ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী—বিষয়টি তদন্তের জন্য স্পেশাল সেলের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন না পাওয়া একটি বই থেকে কীভাবে তথ্য বা কপি বাইরে এল, সেই লিক বা নিরাপত্তা ভাঙনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান রয়েছে।
গত সপ্তাহে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে পার্লামেন্ট চত্বরে বইটির একটি কপি হাতে দেখা যায়। তিনি সেটিকে বইটির কপি বলে দাবি করেন। এর পরপরই বিতর্ক আরও উসকে উঠে। ২ ফেব্রুয়ারি রাহুল গান্ধী লোকসভায় এই স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধৃতি দিতে চেয়েছিলেন। তবে বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত নয়, এই যুক্তিতে তাঁকে তা করতে দেওয়া হয়নি।
এরপর, গত বুধবার পার্লামেন্ট চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাহুল গান্ধী আবারও জেনারেল নারাভানের এই স্মৃতিকথার কথা বলেন। সে সময় তিনি বইটির একটি কপি দেখান এবং বলেন, ভারতের তরুণদের জানা উচিত যে এই বইটির অস্তিত্ব আছে। রাহুল গান্ধী বলেন, ‘স্পিকার বলেছেন এই বইটির অস্তিত্ব নেই, সরকার বলেছে এর অস্তিত্ব নেই, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন এই বইটির অস্তিত্ব নেই। ভারতের প্রতিটি তরুণের উচিত দেখা যে এই বইটি সত্যিই আছে।’
তিনি বলেন, সাবেক সেনাপ্রধান ২০২০ সালে লাদাখে ভারত-চীন সংঘাতের সময়কার ঘটনাগুলোর একটি পূর্ণ বিবরণ এই বইয়ে লিখেছেন। রাহুল গান্ধী আরও জানান, তাকে লোকসভায় এই ‘স্মৃতিকথা’ থেকে উদ্ধৃতি দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
এই অপ্রকাশিত বই নিয়ে বিরোধের জেরে লোকসভায় বিক্ষোভ শুরু হয়। গত মঙ্গলবার, ২০২০ সালের ভারত-চীন সংঘাত নিয়ে এই অপ্রকাশিত স্মৃতিকথার উদ্ধৃতি উল্লেখ করা একটি লেখা থেকে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধৃতি দিতে না দেওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় ‘অশালীন আচরণের’ অভিযোগে আট সাংসদকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাতজন কংগ্রেসের এবং একজন সিপিআই (এম)-এর সাংসদ। তাঁদের বাজেট অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে। এই অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা ২ এপ্রিল।
এরপর রাহুল গান্ধী লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লিখে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে না দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য একটি কলঙ্ক। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে আলোচনা চলাকালে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে কথা বলার সুযোগ না পাওয়া ইতিহাসে এই প্রথম।
বইটি নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত যত গভীর হচ্ছে, ততই প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসছে একটি বিষয়েই। সেটি হলো, কীভাবে একটি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপির অংশ জনসমক্ষে এল।