পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর এবার বড় ধরনের আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে হারের পেছনে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআরকে দায়ী করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস।
তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ ৮০ হাজার নাম বাদ দিয়েছে, যা অন্তত ৩১টি আসনের নির্বাচনী ফলাফলকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। আজ সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কারণে যদি কোনো আসনে প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান বা মার্জিন প্রভাবিত হয়ে থাকে এবং ওই ভোটারদের আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকে, তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ বা প্রার্থীরা সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে ইন্টারলোকিউটরি অ্যাপ্লিকেশন (আইএ) বা অন্তর্বর্তীকালীন আবেদন দায়ের করতে পারবেন।
সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেন দলের বর্ষীয়ান সাংসদ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুনানিতে তিনি কয়েকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ২০২১ সালের নির্বাচনে যে ৩১টি আসনে তৃণমূল জিতেছিল (এবার বিজেপির কাছে হেরে গেছে) তার প্রতিটিতেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের সংখ্যা এবার বিজেপির জয়ী প্রার্থীর মার্জিনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
তিনি একটি আসনের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে তৃণমূল প্রার্থী মাত্র ৮৬২ ভোটে হেরেছেন, অথচ ওই কেন্দ্রটিতে ভোটার তালিকা থেকে ৫ হাজার ৪৩২ জনের নাম রহস্যজনকভাবে কেটে দেওয়া হয়েছিল।
আদালতকে জানানো হয়, রাজ্যজুড়ে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান প্রায় ৩২ লাখ। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহালের জন্য এখনো প্রায় ৩৫ লাখ আপিল আবেদন বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে ঝুলে রয়েছে।
তৃণমূলের পক্ষে আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বলেন, ট্রাইব্যুনালগুলো বর্তমানে যেভাবে কাজ করছে, তাতে এই ৩৫ লাখ আপিল নিষ্পত্তি করতেই অন্তত চার বছর সময় লেগে যাবে। জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, সুপ্রিম কোর্টের অগ্রাধিকার থাকবে যাতে এই আপিলগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য তৃণমূলের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে। কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু আদালতে যুক্তি দেন, যে আসনগুলোতে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে কিন্তু তৃণমূলের প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন।
কমিশনের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী—মালদহ ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের সুজাপুরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। এরপর রঘুনাথগঞ্জে ১ লাখ ৩০ হাজার, শমসেরগঞ্জে ১ লাখ ২৫ হাজার, রতুয়ায় ১ লাখ ২৩ হাজার এবং সূতিতে ১ লাখ ২০ হাজার ভোটারের নাম কাটা পড়েছিল। এই পাঁচটি আসনের সব কটিতেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।
কমিশন আরও দাবি করে, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি আইনি ও নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে সংবিধান অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ প্রার্থীকে নির্বাচন-পরবর্তী ট্রাইব্যুনালে ‘ইলেকশন পিটিশন’ দাখিল করতে হবে; সরাসরি রিট আবেদনের মাধ্যমে এটি চ্যালেঞ্জ করা যায় না।
উল্লেখ্য, এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জিতে প্রথমবারের মতো রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অন্যদিকে, প্রায় ১৫ বছর পর ক্ষমতা হারিয়ে মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস।
নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই এসআইআর এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারী ইস্যুটি বিজেপির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল। বিজেপির অভিযোগ ছিল, তৃণমূল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় ঢুকিয়ে ভোটব্যাংক তৈরি করেছে। বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সশরীরে হাজির হয়ে অভিযোগ করেছিলেন, এটি মূলত প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য ইসি এবং বিজেপির একটি ‘পরিকল্পিত নীল নকশা’।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি