ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসে অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর এবার ভাঙনের আঁচ এসে পড়েছে দেশটির রাজধানীতে। আজ সোমবার দিল্লিতে যখন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করতে ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তার থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন তৃণমূলের অন্তত ১০ জন বিদ্রোহী বিধায়ক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দর যাদবের বাসভবনে এই গোপন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈঠকে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ইনচার্জ ও রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
তৃণমূলের অন্দরের তীব্র বিদ্রোহের মুখে যে ১০ জন এমপি বিজেপির সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন, তাঁরা হলেন শতাব্দী রায়, কাকলী ঘোষ দস্তিদার, আবু তাহের খান, খলিলুর রহমান, অসিত কুমার মাল, অরূপ চক্রবর্তী, কালিপদ সোরেন, জগদীশ চন্দ্র বর্মা বাসুনিয়া, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় ও শর্মিলা সরকার।
এ ছাড়া কয়েক ঘণ্টা আগেই দল থেকে পদত্যাগ করা বর্ষীয়ান রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় এবং মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানও এই বৈঠকে উপস্থিত আছেন বলে জানা গেছে।
এনডিটিভি বলছে, তৃণমূলের ২০ থেকে ২১ জন বিদ্রোহী বিধায়ক দল থেকে আলাদা হয়ে সংসদে একটি স্বতন্ত্র ব্লক বা গোষ্ঠী তৈরি করতে যাচ্ছেন। নতুন এই গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এনডিএ সরকারকে সমর্থন দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
বিদ্রোহী তৃণমূল এমপি শর্মিলা সরকার সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমরা ২০ জন এমপির একটি আলাদা ব্লক গঠন করছি এবং এনডিএকে সমর্থন দিতে যাচ্ছি। কাকলী ঘোষ দস্তিদার আমাদের চিফ হুইপ এবং শতাব্দী রায় আমাদের ডেপুটি লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’
জানা গেছে, কাকলী ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহী বিধায়কেরা আগামীকাল মঙ্গলবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে চিঠি দেবেন এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’ বলে দাবি করবেন।
তৃণমূলের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই দলের একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। দলের ৬০ জন বিধায়ক ইতিমধ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরকে সমর্থন দিয়েছেন। তাঁরা ইতিমধ্যে বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বীকৃতিও দিয়েছেন।
পরিস্থিতি এতটাই বদলে গেছে যে, গত কয়েক দশক ধরে যে দলনেত্রীকে কর্মীরা পরম শ্রদ্ধায় ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করতেন, এখন বিদ্রোহীরা তাঁকে কেবল ‘মমতা’ বলে সম্বোধন করছেন। অনেকেই বলছেন, এটি ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর নেতৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল।
এদিকে সংসদীয় দলে এই বড় ধরনের ভাঙন আঁচ করতে পেরে দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলে একটি বড় সাংগঠনিক রদবদল করেছিলেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রাখলেও তাঁর ক্ষমতা খর্ব করতে রাজ্যসভার দুই প্রবীণ সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে যুগ্ম জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেন মমতা। তবে এই সাংগঠনিক রদবদল বা তড়িঘড়ি নেওয়া পদক্ষেপ দলের এই ভাঙন রুখতে শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।