হৃৎপিণ্ড আকৃতির একটি বিশেষ ধরনের আতা ফল এবার চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাইওয়ানের কৃষকদের এই ফলটির উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে বেইজিংয়ের নেওয়া নতুন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে স্বশাসিত দ্বীপটির কৃষি মন্ত্রণালয়।
তাইওয়ানের তাইতুং কাউন্টির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বিশেষ ফল হলো ‘অ্যাটেমোয়া’ (Atemoya)। এটি মূলত বিভিন্ন প্রজাতির আতা ফলের একটি হাইব্রিড বা সংকর রূপ, যার বাইরের অংশটি খসখসে সবুজ হলেও ভেতরের অংশটি ধবধবে সাদা এবং অত্যন্ত সুস্বাদু।
তাইওয়ানের এই অ্যাটেমোয়ার সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ হলো চীন। চলতি মাসের শুরুর দিকে চীনের জিয়ামেন শহরে অনুষ্ঠিত একটি ফোরামে চীনা কোম্পানিগুলো তাইওয়ান থেকে মাছ ও চায়ের পাশাপাশি এই আতা ফল আরও বড় পরিসরে আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়।
চীনা এই লোভনীয় প্রস্তাবের জবাবে গত শনিবার তাইওয়ানের কৃষি মন্ত্রণালয় একটি প্রেস রিলিজ বা বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সেখানে তারা দাবি করেছে, এটি মূলত চীনের বিখ্যাত ‘রেইজ, ট্র্যাপ, কিল’ (অর্থাৎ টেনে তোলো, ফাঁদে ফেলো এবং মারো) প্রক্রিয়ার একটি চিরাচরিত উদাহরণ। এই প্রক্রিয়ায় বেইজিং প্রথমে তাইওয়ানের কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে তাদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে এবং পরবর্তীতে হঠাৎ বাজার বন্ধ করে দিয়ে তাঁদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২১ সালে চীন পোকা-মাকড়ের অজুহাত তুলে হঠাৎ করেই এই আতা ফল আমদানি স্থগিত করেছিল। এরপর ২০২৩ সালে তারা আংশিকভাবে আমদানি চালু করলেও ২০২৪ সালে ফলটির ওপর বিশাল ট্যাক্স বা শুল্ক চাপিয়ে দেয়। এই ধরনের ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন তাইওয়ানের ফল শিল্পের জন্য মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি করছে। তা ছাড়া চীন এখন নিজেদের মাটিতেও এই অ্যাটেমোয়ার চাষ সম্প্রসারণ করছে, যা তাইওয়ানের স্থানীয় বাজারের জন্য বড় হুমকি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তাইওয়ানকে সামরিকভাবে অবরুদ্ধ করার মহড়া দেওয়ার পাশাপাশি চীন নানা ধরনের অ-সামরিক বা অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। আর এই তালিকায় তাদের অন্যতম অস্ত্র হলো ‘ফল’।
এর আগে ২০২১ সালে চীন একইভাবে তাইওয়ানের বিখ্যাত আনারস আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল, যা তাইওয়ানিজ কৃষকদের জীবিকায় বিশাল ধাক্কা দেয়। সে সময় চীনের এই অর্থনৈতিক জবরদস্তির বিরুদ্ধে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষ প্রচুর পরিমাণে স্থানীয় আনারস কিনে এক অভিনব প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
এদিকে চীনের এই আমদানি নীতিকে ঘিরে তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাইওয়ানের কিছু বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতা চীনের জিয়ামেন ফোরামে অংশ নেওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তাইওয়ানের মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল।
তবে তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং সরকারের এই সতর্কবার্তাকে রাজনীতিকরণের চেষ্টা বলে নিন্দা করেছে। তাইপেই-এর মেয়র চিয়াং ওয়ান-আন সরকারকে কৃষকদের ওপর ‘নিপীড়ন’ করার জন্য দায়ী করে আতা ফলকে ফল জগতের বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট ‘টিএসএমসি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, তাইওয়ানের আতা ফলের মতো এত সুস্বাদু ফল বিশ্বের আর কোথাও উৎপাদিত হওয়া অসম্ভব।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে তাইওয়ানের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কৃষকদের টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল আয়ের জন্য কাজ করবে। এই আতা ফল কাঁচা বিক্রির পাশাপাশি এটি দিয়ে ফ্রোজেন ফ্রুট প্রোডাক্ট, পিউরি এবং আতা ফলের তৈরি বিশেষ ওয়াইন বা মদ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বহুমুখী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।