সাবেক স্বামী এবং শ্বশুরের মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া সাবেক শাশুড়িকে নিজের সংসারে পরম ভালোবাসায় আশ্রয় দিয়েছেন চীনের এক নারী। প্রায় ১২ বছর আগে বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের এই অনন্য নজির সামাজিক মাধ্যমে বিপুল প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
চীনের হেনান প্রদেশের বাসিন্দা লিন (ছদ্মনাম) তাঁর সত্তরোর্ধ্ব সাবেক শাশুড়িকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশে যান। লিনের পরিবারের সঙ্গে এখন সুখে দিন কাটাচ্ছেন ওই বৃদ্ধা।
লিনের সাবেক শ্বশুর ২০২৪ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যান এবং গত বছর তাঁর সাবেক স্বামীরও মৃত্যু হয়। এরপর থেকে গুয়াংডংয়ের প্রাচীন গ্রাম্য ভিটেবাড়িতে একাকী হয়ে পড়েন তাঁর সাবেক শাশুড়ি।
যদিও বৃদ্ধার নিজের আরও পাঁচ সন্তান রয়েছে এবং তাঁরা সবাই তাঁদের মাকে নিজেদের কাছে রাখতে ইচ্ছুক ছিলেন। তবে যে বাড়িতে স্বামী, ছেলে ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে এক দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন, সেই স্মৃতিঘেরা ভিটা ছেড়ে যেতে চাননি বৃদ্ধা।
এদিকে লিনের প্রথম পক্ষের দুই সন্তান বর্তমানে হেনান প্রদেশে লিন ও তাঁর বর্তমান স্বামীর সঙ্গেই বসবাস করছে। ফলে বৃদ্ধা শাশুড়ি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ায় তাঁর নিরাপত্তার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন লিন।
প্রথমে বোঝা হয়ে থাকার ভয়ে লিনের প্রস্তাবে রাজি হননি বৃদ্ধা। তবে লিনের নাছোড়বান্দা ভালোবাসা ও পীড়াপীড়িতে অবশেষে তিনি নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে থাকতে হেনানে আসতে রাজি হন।
লিন জানান, মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়, পাঁচ বছর পর বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি ঘটে। তবে বিচ্ছেদের পরও গত ১৭ বছর ধরে তিনি তাঁর সাবেক শাশুড়িকে ‘মা’ বলেই ডেকে আসছেন।
লিনের মতে, বিচ্ছেদ মানেই সম্পর্কে শত্রুতা নয়। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষেরা আমাকে সব সময় নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন। আমার দুই সন্তানের লালন-পালনের ক্ষেত্রে শাশুড়ি মা সব সময় আমার প্রশংসা করেছেন। বিচ্ছেদের পর দশ বছর আমার সন্তানেরা তাদের বাবার কাছেই ছিল, কিন্তু শাশুড়ি কখনো আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। বরং নিয়মিত খোঁজ নিয়ে বলতেন আমি যেন নিজের যত্ন নিই।’
হেনান প্রদেশে একটি প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবসা পরিচালনা করেন লিন। কঠোর পরিশ্রম করতে দেখে শাশুড়ি প্রায়ই তাঁকে শরীরের ওপর এত চাপ না দেওয়ার পরামর্শ দিতেন।
লিন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘বিচ্ছেদ মানেই পর হয়ে যাওয়া নয়। আমি যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি পেয়েছি, তার প্রতিদান দেওয়া আমার দায়িত্ব।’
এই উদ্যোগে লিনকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন তাঁর বর্তমান স্বামী। লিন তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বোঝাপড়া ও সহযোগিতার জন্য বর্তমান স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
লিনের নিজের গর্ভধারিণী মা-ও মেয়ের এই সিদ্ধান্তকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের সাবেক শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। আজ আমার মেয়ে যে তার শাশুড়ি ও নিজের সন্তানদের নিয়ে এক ছাদের নিচে থাকছে, এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নেটিজেনরা লিনের মানবিকতা ও সাবেক শাশুড়ির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, ‘প্রকৃত সম্পর্কগুলো পারস্পরিক ভালোবাসার ওপর গড়ে ওঠে। আপনি মানুষকে শ্রদ্ধা দিলে বিনিময়ে শ্রদ্ধাই পাবেন।’
তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট