দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানে আঘাত হানা এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার জাপানের কিউশু দ্বীপের কুমামোতো প্রশাসনিক অঞ্চলে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ সংযোগ ধসে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর থেকেই উদ্ধারকারীরা জীবিতদের সন্ধানে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন। ভূমিকম্পের সময় একটি শপিং সেন্টারের একাংশ ধসে পড়ার পর বেশ কয়েকজন মানুষের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর শপিং সেন্টারটিতে একটি বিকট বিস্ফোরণও ঘটে।
বর্তমানে গৃহহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। তবে এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র দাবদাহ। আশ্রিতদের শরীর ঠান্ডা রাখা ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করাই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে। এদিকে, পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে কুমামোতো অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এ কারণে কর্মকর্তা ও উদ্ধারকারীদের হিটস্ট্রোক থেকে বেঁচে থাকতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি কুমামোতোতে ৩০০টি এয়ার কন্ডিশনার পাঠানোর কথা ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে ১৫০টি ইউনিট সরাসরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হবে।
বুধবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গৃহহীন প্রায় ৯ হাজার মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন এবং ৩০ হাজারেরও বেশি পরিবার এখনও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় আছেন। মূল ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০ টিরও বেশি অনুকম্পন (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে। নতুন করে আবার ঝাঁকুনির ভয়ে অনেকেই রাতে নিজের গাড়ির ভেতর ঘুমাচ্ছেন।
উদ্ধার অভিযানের জন্য হাজার হাজার কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়া ভবনগুলোর একটি ছিল কাশিমা অঞ্চলের ইয়ন শপিং সেন্টার। সেখানে দ্বিতীয় তলার একটি অংশ ধসে পড়ায় কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে তল্লাশি চালাচ্ছেন। মূল ভূমিকম্পের ঘণ্টাখানেক পর ইয়ন মলটিতে একটি বিস্ফোরণও ঘটে। মলের মালিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি জানিয়েছেন, এটি কোনো গ্যাস বিস্ফোরণ হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তবে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
এর মাঝে একটি স্বস্তির খবরও পাওয়া গেছে। শপিং সেন্টারের ভেতরে থাকা একটি ক্যাট ক্যাফে বুধবার জানিয়েছে, ভূমিকম্পের আতঙ্কের সময় ক্যাফেতে ফেলে আসা তাদের ২৫টি বিড়ালকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এই ইয়ন মলটি নতুন রূপ দিয়ে গত মাসেই আবার চালু করা হয়েছিল। এর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিলে একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্পে এই শপিং সেন্টারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তৎকালীন সময়ে ওই অঞ্চলে ২৭৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
অন্যদিকে, ইয়াতসুশিরো শহরের একটি নিপ্পন পেপার কারখানাতেও তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। ভূমিকম্পের সময় কারখানাটি আংশিক ধসে পড়ে অন্তত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিপ্পন পেপার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভবনের ভেতরে ১১ জন আটকা পড়েছিলেন, যাদের মধ্যে বুধবার পর্যন্ত ৭ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে সৃষ্ট এই শক্তিশালী ভূকম্পন কুমামোতোর বাসিন্দাদের প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়। ইয়াতসুশিরো শহরের ৭৫ বছর বয়সী এক রেস্তোরাঁ মালিক হিরোকো ওগাতা জানান, ভূমিকম্পের সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি শুরু হলে তিনি নিজের রেস্তোরাঁর একটি টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, ‘আমি ৭৫ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি, কিন্তু জীবনে কখনো এত বড় ভূমিকম্পের মুখোমুখি হইনি। আমার মনে হয়েছিল আমি আর বাঁচব না।’