যাঁদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা আছে, তাঁদের বলা হয়, প্রচুর পানি পান করুন। ধারণা করা হয়, শরীরে পর্যাপ্ত পানির উপস্থিতি বা হাইড্রেশনই এই রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। এর পেছনে যুক্তি হলো, বেশি পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং পাথর সৃষ্টিকারী খনিজ উপাদানগুলো জমাট বাঁধতে পারে না। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ২০২৬ সালে ‘দ্য ল্যানসেট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা।
গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পরিমাণের চেয়ে বেশি পানি পানের পরও ওই রোগীদের কিডনিতে পুনরায় পাথর হওয়ার ঝুঁকি খুব একটা কমেনি। প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিকে এই গবেষণার ফলাফল চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পাথর রোধে শুধু পানি পান করা একমাত্র সমাধান বা ‘সিলভার বুলেট’ নয়।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই গবেষণার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, কিডনিতে পাথর হওয়া বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি যেমন তীব্র যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি একবার ভালো হওয়ার পর আবার হওয়ার আশঙ্কাও এতে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনিতে পাথর হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকই পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে আবারও একই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।
তাহলে প্রশ্ন থাকে, শুধু পানি পান করাই যদি যথেষ্ট না হয়, তবে কার্যকর উপায় কী? উত্তর লুকিয়ে আছে কিডনির সুরক্ষায় সামগ্রিক জীবনযাপনের পরিবর্তনের মধ্যে।
দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণাটির জন্য কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস আছে এমন ১ হাজার ৬০০ ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বেশি করে পানি পান করতে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, যাঁরা বেশি পানি পান করেছেন এবং যাঁরা করেননি, এই দুই দলের মধ্যে পাথর পুনরায় হওয়ার হারে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি।
এর একটি বড় কারণ হতে পারে, অধিক পানি পান করার পরও অনেক অংশগ্রহণকারী পাথর সৃষ্টিকারী উপাদানগুলো দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রস্রাব নির্গত করতে পারেননি। সাধারণত পাথর প্রতিরোধের জন্য দৈনিক অন্তত ২.৫ লিটার প্রস্রাব ত্যাগের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ বেশি পানি পান করলেই যে শরীরে সঠিক জলযোজন বা হাইড্রেশন হবে কিংবা রোগ প্রতিরোধ করা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
রক্তের বর্জ্য ছেঁকে বের করা এবং শরীরের তরলের ভারসাম্য বজায় রাখায় কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রস্রাব যখন খুব ঘন হয়ে যায়, তখন ক্যালসিয়াম, অক্সালেট ও ইউরিক অ্যাসিডের মতো খনিজগুলো জমাট বেঁধে পাথর তৈরি করে। পানি এই উপাদানগুলোকে পাতলা করতে সাহায্য করে ঠিকই, তবে এর সঙ্গে অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সমন্বয় থাকলেই এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
গবেষণা বলছে, কম পানি পান করা পাথর হওয়ার অনেকগুলো কারণের একটি মাত্র। খাদ্যাভ্যাস, লবণের পরিমাণ এবং বিপাকীয় অবস্থাও পাথর তৈরিতে বড় প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ পানি পান করা জরুরি হলেও এটি এককভাবে যথেষ্ট নয়।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রমাণ বলছে, কিডনির পাথর রোধে কেবল পানির চেয়ে খাদ্যাভ্যাস সমান বা ক্ষেত্রবিশেষে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনগুলো প্রস্রাবের রাসায়নিক গঠন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে খনিজগুলো জমাট বাঁধার সুযোগ পায় না।
১. লবণের ব্যবহার কমানো: খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি হলে প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যাওয়ার হার বেড়ে যায়।
২. পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ: প্রচলিত ভুল ধারণা আছে যে ক্যালসিয়াম কমালে পাথর হবে না, কিন্তু আসলে ক্যালসিয়াম কম খেলে উল্টো পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৩. প্রাণিজ আমিষ সীমিত করা: অতিরিক্ত প্রোটিন শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
৪. অক্সালেটযুক্ত খাবার পরিমিত খাওয়া: পালংশাক বা বিটের মতো উচ্চ অক্সালেটযুক্ত খাবার অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
যাঁদের বারবার কিডনিতে পাথর হয়, তাঁদের জন্য কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট না-ও হতে পারে। পাথরের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকেরা ওষুধ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া পানিশূন্যতা, স্থূলতা বা মেটাবলিক ডিসঅর্ডার (বিপাকীয় সমস্যা) থাকলেও পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য এসব সমস্যার সমাধান করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা এখন পর্যাপ্ত পানি পানের পরামর্শ দিচ্ছেন, তবে তাঁদের মনোযোগ এখন কতটুকু পানি খেলেন তার চেয়ে কতটুকু প্রস্রাব হলো সেদিকে। পানির নির্দিষ্ট গ্লাস গুনে খাওয়ার চেয়ে আপনার শরীর ঠিকমতো হাইড্রেটেড কি না, তার সহজ নির্দেশক হলো প্রস্রাবের রং। যদি প্রস্রাবের রং হালকা হলুদ বা পানির মতো পরিষ্কার হয়, তবে বুঝতে হবে শরীর ঠিক আছে।
অধিকাংশ নির্দেশনায় দিনে অন্তত ২ থেকে ২.৫ লিটার প্রস্রাব হওয়ার মতো পানি পানের কথা বলা হয়েছে। তবে আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে এর পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে ঘামের মাধ্যমে অনেক পানি বেরিয়ে যায় বলে সচেতন থাকা প্রয়োজন।