হোম > স্বাস্থ্য

হামের প্রাদুর্ভাব: লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা তবু কমছে না সংক্রমণ

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা

টিকাদানের পরও সংক্রমণ বা মৃত্যু আশানুরূপ কমেনি। এখনো হাসপাতালে আসছে রোগী। গতকাল রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাম প্রতিরোধে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর চলে গেছে দুই মাস সময়। কিন্তু এখনো সংক্রমণ বা মৃত্যু আশানুরূপ হারে কমেনি। হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যাও স্থিতিশীল হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কারও কারও ধারণা, টিকার কভারেজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও কোন কারণে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গণরোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি বলে পরিস্থিতি প্রত্যাশামতো নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এ জন্য তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করে শতভাগ শিশুর টিকা পাওয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

দেশে চলতি বছরের শুরুতেই হামের সংক্রমণ দেখা দেয়। মার্চে এসে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এর পর থেকে নজিরবিহীন হারে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। করোনার পরের বছরগুলোতে এবং ২০২৫ সালের টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতিকে দায়ী করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে গত ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকা দেওয়া শুরু করে সরকার। একপর্যায়ে হাম দেশের সব জেলাতেই বিভিন্ন মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে।

যেসব জেলায় হামের সংক্রমণ বেশি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ তার অন্যতম। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জেলায় ২ লাখ ১ হাজার ৮৯৭ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৪৩৮ শিশুকে। গতকাল শুক্রবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ছিল ১৫ জন। তাদের মধ্যে গত এক দিনে নতুন ভর্তি ৫ জন। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট প্রায় দেড় হাজার রোগী ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে ৭ জন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন বলেন, ‘টিকাদানের ফলে জেলায় হামের সংক্রমণ আগের চেয়ে কমে আসছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। টিকাপ্রাপ্তি থেকে কেউ যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য আমাদের পর্যবেক্ষণ ও কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনে ময়মনসিংহের সদর, ত্রিশাল ও ফুলপুর উপজেলায়ও শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০ জন হাম উপসর্গের রোগী ভর্তি হয়েছে। চলতি বছরে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৭৭৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে ৪৫ জন। ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, তিনটি উপজেলায় শুরুর দিকে সংক্রমণ বেশি থাকলেও বর্তমানে তা অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৯০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

ঝালকাঠির নলছিটি টিকাদানে অগ্রাধিকার পাওয়া ৩০টি উপজেলার অন্যতম। সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, জেলায় এ পর্যন্ত ২৪৩ জন হাম উপসর্গের রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন ২৯ জন। গত এক দিনে নতুন করে ২ জন হাম উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। জেলাটিতে টিকা প্রয়োগের হার ১০০ শতাংশের বেশি। হুমায়ূন কবীরের দাবি, গত ৫ এপ্রিল বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরুর পর থেকে জেলায় সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট তিন দফায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী, এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি শিশু।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিদিনই হাম বা উপসর্গে কয়েকজন শিশুর মৃত্যু ঘটছে। গত কয়েক সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ থেকে ১০-এর কিছু ওপরের মধ্যে ওঠানামা করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে দেশে ২৪৩ জনের হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। ১ হাজার ১৬৮ জনের শরীরে হামের উপসর্গ মিলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার কভারেজ শতভাগ ছাড়ালেও প্রকৃত হামের বিরুদ্ধে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গণরোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ কারণেই পরিস্থিতি প্রত্যাশামতো নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তৃণমূল পর্যায়ে নিবিড় নজরদারির অভাব এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদানের সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় ঘাটতিই এর প্রধান কারণ।

যখন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি নির্দিষ্ট অনুপাতে টিকা দেওয়া যায়, তাহলে সে জনগোষ্ঠীতে আর সংক্রমণ হয় না। একেই বলা হয় গণরোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি। ভেড়ার পালকে (ইংরেজিতে herd) এ পদ্ধতিতে রোগের টিকা দেওয়া হতো বলে বিষয়টি হার্ড ইমিউনিটি নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হামের টিকা দেওয়ার পর শরীরে প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত ১৪-২৮ দিন সময় লাগে। তবে টিকার পর সব শিশুর শরীরে এই প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠছে কি না, তা পরীক্ষার কোনো উদ্যোগ সরকারের নেই। কাগজে-কলমে টিকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ না নেওয়ায় একটি অংশ টিকার বাইরে থেকে যেতে পারে। মাঠপর্যায়ে প্রচারের ঘাটতি দূর করে ভাসমান ও পথশিশুদের শতভাগকেও নিশ্চিতভাবে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, কাগজে-কলমে শতভাগ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ‘মাইক্রো প্ল্যানিং’ বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ না করায় একটি অংশ বাদ পড়ে গেছে। মূলত টিকাকেন্দ্রে আসা শিশুদেরই টিকা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শহরের ভাসমান ও পথশিশুরা টিকার বাইরে রয়ে যেতে পারে।

অব্যাহত শিশুমৃত্যুর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. মুশতাক অপুষ্টির বিষয়টিও সামনে আনলেন। তিনি বলেন, ‘অপুষ্ট শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে দ্রুতই তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। এই পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি (জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক জরুরি অবস্থা) মোকাবিলায় অবিলম্বে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং স্তরভিত্তিক সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি বলে মত দেন ডা. মুশতাক।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশের শিশুদের পুষ্টিহীনতা একটি বড় সমস্যা। একটি অপুষ্ট শিশুর শরীর ভেতর থেকে দুর্বল থাকে। অপুষ্ট শিশুদের টিকা দিলেও তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার গতি অত্যন্ত ধীর থাকে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন করা অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, টিকাদান কার্যক্রমে সরকার-নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১০২ শতাংশ টিকা প্রয়োগ অর্জিত হয়েছে। টিকা কার্যক্রম ২০ মে শেষ হয়েছে এবং এর প্রভাব পরিপূর্ণভাবে বোঝার জন্য আরও সময় প্রয়োজন।

টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা বা মূল্যায়ন চলছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে ডা. হালিমুর বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সার্ভেইল্যান্স কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে। এ বিষয়ে মহাপরিচালকের সঙ্গে আমরা আলাপ করব। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সংক্রমণ অনেক কমে যাবে।’

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ৯১ জন এবং হামের উপসর্গে ৫১৯ জন মারা গেছে। দেশে হাম রোগী ৯ হাজার ৫০৫ জন এবং উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬ হাজার ৮৭৬ জন। তাদের মধ্যে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬২ হাজার ২৩৭ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৮ হাজার ১৫৪ জন।

হামের উপসর্গে আরও ৫ জনের মৃত্যু

পরিবেশের ভারসাম্য ও জীবাণুর রূপান্তর: জনস্বাস্থ্যের জন্য অদৃশ্য মহাবিপদ

প্রথমবার এআইয়ের নকশায় তৈরি হলো ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ টিকা

৬ নবজাতকের মৃত্যু: আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে শোকজ

হাম ও উপসর্গে মারা গেল আরও ৪ জন, মৃত্যু বেড়ে ৬০৫

আদ্-দ্বীনে ৬ শিশুর মৃত্যু হাসপাতালের অবহেলায়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হামের উপসর্গে প্রাণ গেল আরও ৭ জনের, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়াল

মহাখালীর হাসপাতালপাড়া: সন্ত্রাসী চক্রের দাপটে আতঙ্কে চিকিৎসকেরা

হামের প্রাদুর্ভাব: ছোটমণি নিবাসেও হামের থাবা

হামের উপসর্গে প্রাণ গেল আরও ৬ জনের, মোট মৃত্যু ৬০০ ছুঁইছুঁই