এক পায়ে কিছুক্ষণ ভারসাম্য বজায় রাখা দেখতে খুব সাধারণ বলে মনে হয়। তবে অনেকে হয়তো জানেন না, ৫০ বছর বয়সের পর এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে। সাধারণত ৯ থেকে ১০ বছর বয়সে মানুষের এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা পূর্ণতা পায়। ৩০ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে এটি শীর্ষে পৌঁছায়। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তবে প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলন বা সিঙ্গেল লেগ ট্রেনিং আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক দীর্ঘকাল ভালো রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
৩০ বছর বয়সের পর থেকে প্রতি দশকে মানুষের পেশির ভর প্রায় ৮ শতাংশ কমতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে সারকোপেনিয়া বলা হয়। ৮০ বছর বয়সে পৌঁছাতে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। সারকোপেনিয়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি পায়ের পেশি দুর্বল করে দেয়। প্রতিদিন এক পায়ে দাঁড়ানোর অভ্যাস ঊরু, কোমর ও পায়ের পেশি শক্তিশালী রাখে এবং বেশি বয়সেও পেশির ক্ষয় প্রতিরোধ করে।
এক পায়ে দাঁড়ানো চোখ ও কানের ভেতরের ভারসাম্য কেন্দ্র এবং শরীরের অবস্থান অনুভূতির স্নায়ুজালের মধ্যে মস্তিষ্কের সমন্বয় ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কের যে ক্ষয় কিংবা সংকোচন হয়, এই চর্চা তার গতি ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলন মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। আলঝেইমার কিংবা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও যাঁরা এক পায়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেন, তাঁদের মানসিক সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে ধীরগতিতে কমতে থাকে।
বয়স্ক ব্যক্তিদের হঠাৎ পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হওয়ার অন্যতম কারণ মস্তিষ্কের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতার অভাব। এক পায়ে দাঁড়ানোর চর্চা শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখার সময় উন্নত করে। ফলে চলার পথে হোঁচট খেলেও শরীর দ্রুত নিজেকে সামলে নিতে পারে। এক পায়ে দাঁড়াতে হয়—এমন যোগব্যায়াম বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ১৯ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়।
যুক্তরাজ্য এবং ব্রাজিলের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মাঝবয়সের পর যাঁরা অন্তত ১০ সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হন, পরবর্তী ৭ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে তাঁদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৮৪ শতাংশ বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষকে সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন এবং ৫০ পেরোনো ব্যক্তিদের প্রতিদিন ১০ সেকেন্ড করে উভয় পায়ে আলাদা করে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন। সকালে দাঁত ব্রাশ করা, চা বানানো কিংবা থালাবাসন ধোয়ার মতো সহজ কাজের ফাঁকে ১০ সেকেন্ড করে এক পায়ে দাঁড়ানোর চর্চা করা যায়। খালি পায়ে এবং জুতা পরে চর্চা করার অনুভূতি ভিন্ন, তাই দুভাবেই এটি পর্যায়ক্রমে করা ভালো। বার্ধক্য জয় করতে বা দীর্ঘকাল স্বাধীন ও সুস্থ জীবনযাপনে প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিটের এই এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলন আপনার জীবনে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পারে।
সূত্র: বিবিসি, মায়ো ক্লিনিক