শিশুদের কোমল ত্বকে হুট করে দেখা যায়, ছোট ছোট লালচে গুটি কিংবা ফোসকা দেখা দেয়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যেকোনো অভিভাবক। বিশেষ করে বর্ষা বা গরমের দিনে প্লে-স্কুল ও নার্সারিগামী শিশুদের মধ্যে বা আরও ছোট বাচ্চাদের মধ্যে একটি সংক্রামক ব্যাধি প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ’। এটি মূলত শিশুদের একটি ছোঁয়াচে ভাইরাল সংক্রমণ। সময়মতো সঠিক যত্ন ও সচেতনতা থাকলে সামান্য চিকিৎসাতেই এটি পুরোপুরি সেরে যায়।
হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ কী
হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ হলো একধরনের অতিসংক্রামক মৌসুমি ভাইরাল ইনফেকশন। এটি মূলত ছোট বাচ্চাদের শরীর আক্রান্ত করে। রোগটির নামের মধ্যেই এর ধরন লুকিয়ে রয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত শিশুর হাত, পা ও মুখের ভেতরে লালচে দানা কিংবা ব্যথাদায়ক ফোসকা দেখা যায়। ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সাধারণত এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেলেও শিশুশ্রেণি ও নার্সারির বাচ্চারাই এর প্রধান শিকার হয়।
কোন ভাইরাস দায়ী
হ্যান্ড, ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ ‘এন্টারোভাইরাস’ গোত্রের ভাইরাসে মূলত হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী দুটি নির্দিষ্ট ভাইরাস হলো—
- কক্সস্যাকিভাইরাস এ-১৬: এটিই এই রোগের সবচেয়ে প্রধান এবং সাধারণ কারণ। সাধারণত এই ভাইরাসের সংক্রমণে রোগটি মৃদু আকারের হয় এবং শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
- এন্টারোভাইরাস-৭১: এটি দ্বিতীয় প্রধান কারণ। এই ভাইরাসের কারণে এশিয়ায় মাঝে মাঝে এই রোগের কিছুটা বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
এ ছাড়া মাঝে মাঝে কক্সস্যাকিভাইরাস এ৬ দিয়েও এই সংক্রমণ ঘটতে পারে।
যাদের বেশি হয়
এই রোগ সব বয়সের মানুষের হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি অনেক বেশি।
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু: যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
- স্কুল ও ডে-কেয়ারের শিশু: শিশুরা যখন একসঙ্গে খেলাধুলা করে, খেলনা অদলবদল করে অথবা খাবার ভাগ করে খায়, সে সময় রোগটি দ্রুত ছড়ায়।
- বিরল ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্করা: সাধারণত বড়দের প্রতিরোধক্ষমতা বেশি থাকায় তাঁরা আক্রান্ত হন না। তবে ঘরে অসুস্থ শিশু থাকলে ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে কম রোগ প্রতিরোধসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্করাও মৃদু উপসর্গসহ আক্রান্ত হতে পারেন।
কেন এবং কীভাবে ছড়ায়
এই ভাইরাসগুলো অত্যন্ত দ্রুত ছড়াতে পারে। রোগটি ছড়ানোর প্রধান মাধ্যমগুলো হলো:
- হাঁচি-কাশি: আক্রান্ত শিশুর হাঁচি কিংবা কাশির মাধ্যমে বাতাসে থাকা ভাইরাসের বিন্দু অন্য শিশুর শরীরে প্রবেশ করে।
- স্পর্শ: আক্রান্ত বাচ্চার থুতু, সর্দি অথবা ফোসকার ভেতরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে।
- সরাসরি স্পর্শ: ভাইরাসে আক্রান্ত শিশু; যেসব খেলনা, দরজার হাতল, তোয়ালে বা থালাবাসন স্পর্শ করে, অন্য শিশু তা ব্যবহার করলে।
- মলমূত্র: ডায়াপার পরিবর্তনের পর হাত ভালোভাবে পরিষ্কার না করলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ
ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৩ থেকে ৬ দিন পর শিশুর শরীরে প্রথম লক্ষণ দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
- হালকা থেকে মাঝারি জ্বর: রোগের শুরুতে হঠাৎ ১০০ থেকে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর আসতে পারে।
- গলাব্যথা ও খাওয়ার অনিচ্ছা: গলায় অস্বস্তি হওয়ায় বাচ্চা কিছু গিলতে পারে না এবং কান্নাকাটি করে।
- মুখের ভেতরের ঘা: জিব, মাড়ি ও গালের ভেতরের চামড়ায় ছোট ছোট লালচে ঘা বা ব্যথাদায়ক ফোসকা দেখা দেয়।
- হাত ও পায়ে ফোসকা: হাঁটু, কনুই, হাতের তালু, পায়ের তলা এবং মুখের ভেতরে ছোট ছোট লাল গুটি বা তরল ভরা ফোসকা ওঠে। এগুলোতে সাধারণত চুলকানি হয় না, তবে ব্যথা থাকতে পারে।
- শরীরে ক্লান্তি ও অস্থিরতা: শিশু খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
সম্ভাব্য জটিলতা
সাধারণত এইচএফএমডি কোনো মারাত্মক রোগ নয়। ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এমনিতেই সেরে যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে:
- ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: মুখের ঘা এবং ব্যথার কারণে শিশু পানীয় বা খাবার খেতে চায় না। ফলে শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
- নখ পড়ে যাওয়া: রোগ সেরে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর সাময়িকভাবে হাত বা পায়ের নখ ভেঙে কিংবা খুলে যেতে পারে, যা পরে আবার স্বাভাবিকভাবে হয়ে যায়।
- বিরল জটিলতা: অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে এন্টারোভাইরাস-৭১ থেকে মস্তিষ্কের প্রদাহ বা মেনিনজাইটিস হতে পারে।
চিকিৎসা
এখনো এই ভাইরাল ইনফেকশনের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগের লক্ষণগুলো উপশম করা এবং শিশুকে স্বস্তিতে রাখা:
- জ্বরের চিকিৎসা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। (কখনোই শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন দেওয়া যাবে না)।
- তরল খাবার: শিশু যেন পানিশূন্যতায় না ভোগে, সে জন্য পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি
- বা ঠান্ডা দুধ খাওয়াতে হবে।
- নরম ও ঠান্ডা খাবার: গরম, টক, ঝাল বা শক্ত খাবার মুখের ঘা বাড়িয়ে দেয়। তাই ঠান্ডা স্যুপ, আইসক্রিম, দই বা নরম খিচুড়ি দেওয়া ভালো।
- অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ: বড় শিশুদের ক্ষেত্রে হালকা স্যালাইন ওয়াটার কিংবা চিকিৎসকের দেওয়া মাউথওয়াশ দিয়ে কুলি করানো যেতে পারে।
প্রতিরোধে অভিভাবকদের করণীয়
এইচএফএমডি থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিছু নিয়ম মেনে চললে রোগের ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব:
- হাত ধোয়ার অভ্যাস: সাবান-পানি দিয়ে শিশুর হাত অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ভালো করে ধোয়ার অভ্যাস করান। বিশেষ করে বাইরে থেকে আসার পর এবং খাওয়ার আগে।
- আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা: শিশু আক্রান্ত হলে তাকে স্কুলে না পাঠিয়ে ৭-১০ দিন ঘরে বিশ্রাম নিতে দিন, যাতে অন্য শিশু সংক্রমিত না হয়।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: শিশুর খেলার জায়গা, খেলনা এবং ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করুন।
- ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার না করা: আক্রান্ত হওয়া শিশুর গ্লাস, থালা, তোয়ালে বা পরিধেয় কাপড় পরিবারের অন্য শিশুদের ব্যবহার করতে দেবেন না।
চিকিৎসকের কাছে দ্রুত যাবেন কখন
যদি দেখেন শিশুর জ্বর তিনি দিনের বেশি স্থায়ী হচ্ছে, শিশু একেবারেই তরল খাবার সে গিলতে পারছে না, প্রস্রাবের পরিমাণ অনেক কমে গেছে, অথবা শিশু অতিরিক্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ছে, তাহলে মোটেই কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
অভিভাবকদের সঠিক যত্ন, সুষম খাদ্যাভ্যাস আর একটু সচেতনতাই পারে শিশুকে দ্রুততম সময়ে সুস্থ করে তুলতে।
ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ