তেল আবিবের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, এটি তেল আবিব বিমানবন্দরের ঘটনার দৃশ্য।
এই দাবিতে ফেসবুকে পোস্ট আছে এখানে, এখানে , এখানে এবং এখানে ।
আলোচিত দাবিতে PBN TV নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ১২ মার্চ বিকেল ৪টা ৩৬ মিনিটে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা ভিডিওটি আজ (১৫ মার্চ) বেলা ১টা ৩০মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২৩ লাখবার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে ৩৬ হাজার রিঅ্যাকশন রয়েছে এবং ৮৭৮টি কমেন্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটি প্রায় ২ হাজার ৭০০ বার শেয়ার করা হয়েছে। শেয়ার করা ভিডিওটির কমেন্টে নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
পর্যবেক্ষণে ভিডিওতে দেখা যায়, জায়গাটি লম্বা করিডোরের মতো। ওপরে কাচের বা স্বচ্ছ আর্চ-আকৃতির ছাদ রয়েছে। দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দোকান বা শোরুমের মতো কাঠামো দেখা যায়। করিডরের ভেতরে অনেক মানুষকে দৌড়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। সামনে কয়েকজন নারীকে কালো পোশাকে দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া ভিডিওটিতে দেখানো করিডরের কাচের ছাদে হঠাৎ আঘাতে কাচ ভেঙে পড়তে দেখা যায়। একপর্যায়ে পুরো করিডর ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় এবং চিৎকার ও সাইরেনের শব্দ শোনা যায়।
ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন বা ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ‘No middle ground: Israelis back Iran war, despite taking mounting hits’ শিরোনামে ১০ মার্চের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান দাবি করেছে যে তারা ইসরায়েলজুড়ে হামলা চালিয়েছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এমনকি নেতানিয়াহুর কার্যালয়েও আঘাত হেনেছে।
প্রতিবেদন বলা হয়, তেহরান এই হামলাগুলোকে সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত বলে বর্ণনা করেছে। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা তেল আবিব, বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং হাইফাকে লক্ষ্য করে হামলা করেছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই দাবিগুলো অস্বীকার করেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে ইরানের এসব দাবিকে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে আল জাজিরা ‘Iran launches wave of strikes at Israel: Damage reported in multiple cities’ শিরোনামে ১৫ মার্চ একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে ইসরায়েলের একাধিক স্থানে হামলা এবং বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরসহ মধ্য ইসরায়েলেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ভিডিওতে তেল আবিবের নিকটস্থ এলাকা, সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের বিভিন্ন অংশে হামলার ক্ষয়ক্ষতির ফুটেজ থাকলেও ভাইরাল ভিডিওটিতে উল্লেখিত দাবির কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যম The Times of India ৬ মার্চ ‘Tel Aviv Airport HIT: Iran’s Ballistic Revenge Shocks Israel; Khorramshahr Targets BEN GURION’ শিরোনামে তাদের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ওই ভিডিওতে বলা হয়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আরজিসি) দাবি করেছে, তারা উন্নত খোররামশহর-৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রকাশিত ওই ভিডিওতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, হামলার দৃশ্য, আঘাত হানার দৃশ্য এবং তেল আবিবের রাস্তায় মানুষের ছুটে চলার কিছু ফুটেজ থাকলেও আলোচিত ভাইরাল ভিডিওটির দৃশ্য পাওয়া যায়নি।
পাশাপাশি আলোচিত দাবিতে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে কোনো তথ্যসূত্রের উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ইসরায়েলি গণমাধ্যমেও হামলার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি।
ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি কি না—তা নিশ্চিত হতে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম হাইভ মডারেশনের সহায়তা নেয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় ৮৭ শতাংশ।
সিদ্ধান্ত
তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ভিডিওর উল্লেখ নেই। উপরন্তু এআই শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্মের বিশ্লেষণে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে জানা গেছে।