একজন বাঙালি নারী তাঁর পিঠে একজন ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে বহন করছেন—এমন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৮ আগস্ট ‘Hypocrite বাঙালি বাবু’ নামের একটি ফেসবুক পেজে আলোচিত দাবিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘এদের কে চিনতে পারছেন? এরা সেই ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের পূর্বপুরুষ, যাদের উত্তরসূরিরা আজ বিশ্বকে সভ্যতা, মানবতা ও নৈতিকতা শেখানোর চেষ্টা করে...।’
অন্যদিকে, ‘ilyasahshabazz’ নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে আলোচিত ছবিটি শেয়ার করে এর ক্যাপশনে বলা হয়, ছবিটির পেছনে রয়েছে উপনিবেশবাদের অমানবিক ইতিহাস, যা বিশ্বজুড়ে বৈষম্য ও বর্ণবাদের নির্মমতার প্রতীক।
এমন আবেগঘন ও ঐতিহাসিক দাবির কারণে পোস্টটি নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্ভবত ‘Duke Of Nigeria’নামের একটি ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে গত ২৫ জুন আলোচিত দাবিতে প্রথম পোস্ট (ছবি) করা হয়। ওই পোস্টে এখন পর্যন্ত ৯৩ হাজার রিয়েকশন, ৬ হাজার ২০০ কমেন্ট এবং ২২ হাজার রিপোস্ট রয়েছে।
আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এক নারী তাঁর পিঠে করে একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে বহন করছেন। পুরুষটি লাগামের মতো করে দড়ি ধরে আছেন। এ ছাড়া কয়েকটি ভিডিও ও ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে একাধিক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
তবে পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। যেমন— ছবিটিতে দেখা যায়, লোকটির হাতের আঙুলগুলো একটি অপরটির সঙ্গে প্রায় জোড়া লেগে আছে। তাঁর পরিহিত জুতাগুলো ডার্বি সু-এর মতো হলেও তাতে কোনো ফিতা নেই।
দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধান করে দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধানে ‘nhasnatsenzai’ নামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ওই পোস্টে আলোচিত ছবিটি জুড়ে দিয়ে ক্যাপশনে বলা হয়েছে এটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি।
প্রচারিত ছবি ও ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কিনা, তা নিশ্চিত হতে একাধিক এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্মের-এর সাহায্য নেওয়া হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রচারিত ছবি ও ভিডিওটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।
ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আমলে ধারণ এমন কোনো ছবির অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা জানতে অনুসন্ধানে ‘উইকিমিডিয়া কমন্স’-এ ‘A British merchant being carried by a Sikkimese lady’ শিরোনামে ১৯০৩ সালের একটি ছবির সন্ধান পাওয়া যায়।
উইকিমিডিয়া কমন্সে ২০১৩ সালে আপলোড করা ওই ছবিটির বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৯০৩ সালের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং অঞ্চলে এক সিকিমি নারী একজন ব্রিটিশ বণিককে ঝুড়িতে করে তাঁর পিঠে বহন করেছিলেন।
তবে ‘ফেইক হিস্টোরি হান্টার’ নামে একটি ব্লগে ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর ‘Not a French colonial administrator being carried’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে ছবিটি নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানধর্মী নিবন্ধটিতে নানা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ছবিটিতে সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে একজন সিকিম ভুটিয়া নারীকে দেখা যাচ্ছে, যিনি একজন ব্রিটিশ বণিককে বহন করছেন। ওই বণিক ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার-ভিত্তিক একটি গ্রিক বাণিজ্য সংস্থায় কাজ করতেন।
নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ওই ব্যক্তি ব্রিটিশ শাসকদের অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না এবং তিনি ওই নারীর অঞ্চলেরও বাসিন্দা ছিলেন না, বরং কলকাতা থেকে আসা একজন সাধারণ দর্শণার্থী ছিলেন।
তবে তিনি অবশ্যই একজন পশ্চিমা এবং ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণীর অংশ, আর ওই নারীও ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা একজন।
কিন্তু ওই শ্বেতাঙ্গ পুরুষ তাঁর ব্রিটিশ বা ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রভু কিংবা কোনো ব্রিটিশ কর্মকর্তাকে বহন করছেন না। ওই ব্যক্তিকে বহন করতে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছে বা চাপ দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে তিনি স্বেচ্ছায় বা কোনো নিরীহ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে এটি করছেন, এমন কোনো প্রমাণও নেই। ওই অঞ্চলের বাহকেরা বা কুলিরা প্রকৃতপক্ষে তাঁদের শক্তি এবং ভারী বোঝা বহন করার সক্ষমতার জন্য পরিচিত ছিলেন।
ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারীকে ইউরোপীয় পুরুষকে পিঠে বহন করতে বাধ্য করা হতো দাবিতে প্রচারিত ছবি ও ভিডিওটি বাস্তব নয়। এগুলো এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি।