বাংলাদেশি পরিচয়ের কারণে ভারতে এক রোগীকে চিকিৎসক মারধর করছেন—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
‘Alamin Tapodar’ , ‘প্রতিবাদী নজরুল’ , ‘Jahangir Alam’ , ‘টেকনোলজি কি ভাবে কি হয়’ , ‘SNIK প্রতিবাদী নজরুল’ -সহ ২০টিরও বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে।
এর মধ্যে ‘SNIK প্রতিবাদী নজরুল’ নামের পেজে গত ২৮ জুলাই পোস্ট করা ভিডিওটি ১ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে ১ আগস্ট দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশই দাবিটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
ভাইরাল ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘LatestLY’-এর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে l ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর একটি দৃশ্যের হুবহু মিল রয়েছে।
ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ইন্দোরের সরকারি হাসপাতালে এক এইচআইভি আক্রান্ত ৪৫ বছর বয়সী রোগীকে মারধরের অভিযোগে এক জুনিয়র চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উজ্জয়িনীর একটি হাসপাতাল থেকে ভাঙা হাড়ের চিকিৎসার জন্য রোগীকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসা শুরুর আগে রোগী বা তাঁর স্বজন চিকিৎসককে রোগীর এইচআইভি সংক্রমণের বিষয়টি জানাননি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে ওই চিকিৎসক রোগীকে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা অবস্থায় চড় মারেন এবং গালিগালাজ করেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। অন্যদিকে রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, বাধা দিতে গেলে চিকিৎসক তাঁকেও মারধর করেন এবং পরে এ ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর হেল্পলাইনে অভিযোগ করা হয়।
একই তথ্য পাওয়া যায় ভারতীয় গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি’ , ‘দৈনিক ভাস্কর’ ও ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র প্রতিবেদন থেকেও। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ বা তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে বাংলাদেশিদের ওপর হামলার অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা অনুসন্ধানে চলতি বছরের ২৫ জুলাই প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বেঙ্গালুরুর বেল্লান্দুর এলাকায় নাসরিনা বিলাল ও তাঁর স্বামী মোহাম্মদ বিলাল নামের এক বাংলাদেশি দম্পতিকে মারধরের অভিযোগে এক চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, চিকিৎসক নাগেন্দ্র তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডার জেরে তাঁদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। পরে ওই দম্পতির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে তিনি জামিন পান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিযুক্ত ওই চিকিৎসক দাবি করেন, এলাকায় অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সন্দেহের বশে তিনি ওই দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তবে পুলিশ জানায়, কারও নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই; বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো উচিত ছিল। একই সঙ্গে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগকারী দম্পতি বাংলাদেশের নাগরিক এবং ভারতে তাঁদের অবস্থানের বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে। দেশীয় গণমাধ্যমেও একই তথ্য পাওয়া গেছে।
সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশি হওয়ায় ভারতে রোগীকে চিকিৎসকের মারধর দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার। প্রকৃতপক্ষে, এটি ২০২৩ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ইন্দোরে এইচআইভি আক্রান্তের তথ্য গোপনের জেরে এক রোগীকে চিকিৎসকের মারধরের পুরোনো ঘটনা। রোগীও ভারতের নাগরিক।