অগ্নিনির্বাপক ফোমে ব্যবহৃত ক্ষতিকর ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক দ্বারা পরিবেশ দূষণের অভিযোগে মার্কিন বহুজাতিক জায়ান্ট ৩এম-এর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। এই দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোম্পানিটির কাছে ২০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের (প্রায় ১.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেশি দাবি করা হয়েছে।
অস্ট্রেলীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিনেসোটাভিত্তিক এই রাসায়নিক প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং এর স্থানীয় শাখার বিরুদ্ধে দায়ের করা এই মামলাটি দেশটির ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি। এই বিশাল অঙ্কের দাবি মূলত পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে প্রতিফলিত করে।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল মিশেল রোল্যান্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘৩এম-এর বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে এই অগ্নিনির্বাপক ফোমের ব্যবহার ও সংরক্ষণের ফলে সৃষ্ট দূষণ পরীক্ষা এবং তা মোকাবিলায় সরকারের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে, তা পুনরুদ্ধার করতেই এই ২০০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করা হচ্ছে।’
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশজুড়ে অন্তত ২৮টি সামরিক ঘাঁটিতে এই অগ্নিনির্বাপক ফোম ব্যবহার করেছিল। সরকারের অভিযোগ, ৩এম কোম্পানি আশ্বাস দিয়েছিল যে এই রাসায়নিকটি পরিবেশবান্ধব, বিষাক্ত নয় এবং এটি নিরাপদে অপসারণযোগ্য।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল রোল্যান্ড অভিযোগ করেন, ৩এম তাদের নিজস্ব পরীক্ষাগারের পরীক্ষার তথ্য গোপন করেছিল, যাতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে এই ফোম ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এক বিবৃতিতে ৩এম জানিয়েছে, তারা আদালতে এই দাবির বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ৩এম কখনোই অস্ট্রেলিয়ায় পিএফএএস তৈরি করেনি এবং প্রায় দুই দশক আগেই সেখানে বিতর্কিত পণ্যগুলোর বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। উল্টো প্রতিরক্ষা বিভাগের দিকে ইঙ্গিত করে তারা বলে, বিক্রি বন্ধের পরও দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ আরও প্রায় দুই দশক ধরে পিএফএএস সমৃদ্ধ এই অগ্নিনির্বাপক ফোম ব্যবহার করে গেছে।
পিএফএএস হলো মানুষের তৈরি একদল রাসায়নিক উপাদান, যা তাপ, দাগ, তেল ও পানি প্রতিরোধী পণ্য তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে বা পরিবেশের সঙ্গে সহজে মিশে যায় না বা ভেঙে যায় না বলে এদের ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বা ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়।
এই রাসায়নিকগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তুতন্ত্র, সুপেয় পানি এবং মানুষের শরীরে জমা হতে থাকে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পিএফএএস-এর সংস্পর্শে থাকলে লিভারের ক্ষতি, নবজাতকের কম ওজন এবং টেস্টিকুলার ক্যানসারের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সহকারী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিটার খলিল জানান, এই দূষণের প্রভাব মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রায় ১৩০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আইনি নিষ্পত্তির অংশ হিসেবেই দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
এ ছাড়া, প্রতিরক্ষা বিভাগ এ পর্যন্ত ২ লাখ টনেরও বেশি দূষিত মাটি অপসারণ বা শোধন করেছে এবং ১৩ বিলিয়ন (১ হাজার ৩০০ কোটি) লিটারেরও বেশি পানি প্রক্রিয়াজাত করেছে।
পিটার খলিল বলেন, ‘স্মরণকালের মধ্যে কমনওয়েলথ ও প্রতিরক্ষা বিভাগের নেওয়া এটিই সবচেয়ে বড় আইনি পদক্ষেপ। সহজ কথায়, আমরা অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের পক্ষে ৩ এম-এর বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে নেমেছি।’
উল্লেখ্য, ক্ষতিকর পিএফএএস দূষণের দায়ে ৩এম কোম্পানি বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার দূষণ সংক্রান্ত দাবি নিষ্পত্তি করতে ১০.৩ বিলিয়ন (১ হাজার ৩০ কোটি) ডলারের একটি বিশাল ক্ষতিপূরণ চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল কোম্পানিটি।