দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল উদ্যোগ থেকে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে প্রতিবছর প্রায় এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলার আয় করতে পারে বাংলাদেশ। সরকারের একটি সাম্প্রতিক জলবায়ু অর্থায়ন বাজেট প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের হিসাবের বরাত দিয়ে এই সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে।
তবে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক এই বিশাল সম্ভাবনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশ করার জন্য বাংলাদেশের আইনি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
১৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব মোকাবিলা করার লক্ষ্যেই এই সবুজ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই পাঁচ বছর মেয়াদি মহা উদ্যোগের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো—এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট উৎপাদন ও তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করার সুযোগ।
কার্বন ক্রেডিট হলো মূলত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর একটি আন্তর্জাতিক পরিমাপক। এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা তার সমতুল্য ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ, হ্রাস বা প্রতিরোধ করা গেলে তা ‘এক কার্বন ক্রেডিট’ হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশে নতুন করে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হলে তা বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করবে, যা কার্বন ক্রেডিট হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা সম্ভব।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্বন বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে এসে বৈশ্বিক কার্বন মূল্য নির্ধারণ বাজার থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি।
বর্তমানে এই বাজারের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই বাজার এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারে পৌঁছাবে, যেখানে মূল বিনিয়োগ আসবে বেসরকারি খাত থেকে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি যথাযথ উপায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন বাণিজ্য থেকে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।
সরকারি প্রতিবেদনটিতে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু আশঙ্কাজনক ঘাটতির কথাও সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে পূর্ণাঙ্গ অংশীদার হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। এর পেছনে প্রধান তিনটি দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে:
প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব: প্যারিস চুক্তির ‘আর্টিকেল ৬’ ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও কার্বন বাণিজ্যের জটিল কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নীতিনির্ধারক ও অংশীজনদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত।
দুর্বল আইনি কাঠামো: দেশে কার্বন ক্রেডিট ইস্যু, নিয়ন্ত্রণ এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচার জন্য এখনো কোনো শক্তিশালী আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা গড়ে ওঠেনি।
এমআরভি (MRV) সক্ষমতার ঘাটতি: কার্বন নির্গমন হ্রাস সঠিকভাবে পরিমাপ, প্রতিবেদন তৈরি এবং যাচাই (Measurement, Reporting, and Verification - MRV) করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতিগুলো দূর করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার সাধন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্বন তহবিল গঠনে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│ গাছ রোপণ ➔ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ➔ পরিমাপ ও যাচাই (MRV)
└───────────────────────────-────────────────────────────┘
▼
┌──────────────────────────────────────────────────────┐
│ কার্বন ক্রেডিট ইস্যু ➔ আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি ➔ অর্থ লাভ
└──────────────────────────────────────────────────────┘
কার্বন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ একদম নতুন নয়। এর একটি সফল ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
২০০৬ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’ (আইডিসিওএল) জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংস্থায় (ইউএনএফসিসিসি) বাংলাদেশের প্রথম ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম) প্রকল্প নিবন্ধন করে। সৌরবিদ্যুৎ এবং উন্নত চুলা প্রকল্পের মাধ্যমে আইডিসিওএল এ পর্যন্ত ২ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করেছে।
এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ আয় করেছে ১৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৭০ কোটি টাকার সমান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইডিসিওএলের এই অতীত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে কার্বন প্রকল্প তৈরি এবং তা সফলভাবে পরিচালনা করার মতো প্রাথমিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। এখন প্রয়োজন এই অভিজ্ঞতাকে দেশব্যাপী আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া।
শুধু অর্থনৈতিক লাভই নয়, সরকারের এই ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ সফল হলে দেশের সামগ্রিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই বনায়নের ফলে:
দেশের সামগ্রিক তাপমাত্রা হ্রাস পাবে।
বৃষ্টিপাতের ধরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, যা কৃষির জন্য সহায়ক।
মাটির ক্ষয়রোধ হবে এবং উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সহনশীলতা অনেক গুণ বাড়বে।
বাংলাদেশ যদি সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে নিজেদের আইনি ও কারিগরি দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে, তবে ২৫ কোটির এই সবুজ বিপ্লব কেবল দেশের পরিবেশকেই রক্ষা করবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতে ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি’র এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।