পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ বিপন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। বগুড়া শহরের ১১৫টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদে ধ্বংসের বদলে বছরের পর বছর উন্মুক্ত স্থানে স্তূপ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান স্বপ্নের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই দশক ধরে ‘স্বপ্ন’ অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ করলেও সেগুলো পরিবেশ সম্মত উপায়ে ধ্বংস করছে না। ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চিকিৎসা বর্জ্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। ফলে রক্তমাখা ব্যান্ডেজ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের সেট, গ্লাভসসহ নানা চিকিৎসা বর্জ্যের ছোটখাটো পাহাড় তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের জয়পুরপাড়া এলাকায় স্বপ্নের নিজস্ব জায়গায় বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য উন্মুক্তভাবে পড়ে আছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব বর্জ্য শোধনাগারে (ইটিপি) পরিশোধন বা অনুমোদিত পদ্ধতিতে ধ্বংস করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটিতে ইটিপি থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর।
বর্জ্যের একটি অংশ খোলা জায়গায় পুড়িয়ে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। বর্জ্য পোড়ানোর সময় কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। দুর্গন্ধ ও ধোঁয়ার কারণে শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়।
চিকিৎসা বর্জ্যের স্তূপের আশপাশেই রয়েছে অন্তত ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি হাজারো মানুষের বসতি। কয়েকটি মহল্লার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র সড়কও এই বর্জ্যের পাশ দিয়ে গেছে। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, পথচারী ও বাসিন্দারা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে এখান দিয়ে চলাচল করছে। বর্ষাকালে বর্জ্যমিশ্রিত পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিতা রানী, জয়ন্ত কুমার বলেন, বর্ষাকালে পানি জমে গলে এসব বর্জ্য ভেসে বাড়ির দরজায় চলে আসে। এর মধ্যে চলাচল করতে গিয়ে পায়ে ইনজেকশনের সুচ ঢুকে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া ময়লা পানির কারণে পায়ে ঘা বা চুলকানি লেগেই থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল থেকেই চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। অথচ নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হচ্ছে না। এ ব্যাপারে বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান স্বপ্নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাপা বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা বর্জ্য সংগ্রহ না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। তবে বিভিন্ন কারণে বর্জ্য জমিয়ে রাখা ঠিক হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত সেগুলো অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এলাকাবাসীর ভাষ্য, অভিযোগ জানাতে গিয়ে উল্টো অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে। দ্রুত বর্জ্য অপসারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও চিকিৎসা বর্জ্যের স্তূপ কীভাবে জমল, এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহাথীর বিন মোহাম্মদ বলেন, বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব বগুড়া সিটি করপোরেশনের।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে ফেলে রাখা মোটেও ঠিক না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।