স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুলের এক টানেই বদলে যাচ্ছে দৃশ্য। কোনোটি ছদ্মবেশী কোটিপতির গল্প, কোনোটি প্রতিশোধের নেশায় মত্ত অতৃপ্ত আত্মার কাহিনি, আবার কোনোটি অতিমানবিক ক্ষমতার রোমাঞ্চ। তবে এই নাটকগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা নয়, বরং প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য মাত্র দুই মিনিটেরও কম। ভারতে বর্তমানে ঝড়ের গতিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই ‘মাইক্রো-ড্রামা’ বা ক্ষুদ্রাকার নাটক, যা বিনোদনের প্রথাগত সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে।
ভারী খাবারের বদলে মানুষ যেমন এখন ‘স্ন্যাক্স’ বা হালকা খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, বিনোদন জগতেও অনেকটা তেমনই পরিবর্তন এসেছে। রাজস্থান রাজ্যের উদয়পুরের গৃহিণী নিতা ভোজওয়ানি থেকে শুরু করে মেগাসিটির ব্যস্ত চাকরিজীবী—সবাই এখন অবসর সময়ে স্মার্টফোনে এই ছোট নাটকগুলো দেখছেন। নিতা জানান, ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি প্রথম এই নাটকের সন্ধান পান এবং এখন তিনি নিয়মিত বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন কিনে এই নাটকগুলো দেখছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের পথে বা কাজের ফাঁকে সময় কাটানোর জন্য এটি সেরা মাধ্যম।
ভারতের এই মাইক্রো-ড্রামা বা ক্ষুদ্র নাটকের বাজার বর্তমানে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘লুমিকাই’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ এই বাজারের আকার দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এটি বর্তমানে ভারতের দ্রুততম বর্ধনশীল বিনোদন মাধ্যম।
আগে এটি কেবল কিছু স্টার্টআপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এখন ভারতের বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো এতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির জিওস্টার কোম্পানি গত এপ্রিলে ‘তড়কা’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যেখানে ইতিমধ্যেই ১০০টিরও বেশি শো রয়েছে।
বলিউডের নামী প্রতিষ্ঠান যশরাজ ফিল্মস এবং শাহরুখ খানের রেড চিলিস এন্টারটেইনমেন্টও এই খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া টিভি নেটওয়ার্ক জি এন্টারটেইনমেন্ট এবং বালাজি টেলিফিল্মসের মতো পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোও ছোট স্টার্টআপগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধছে।
এই মাইক্রো-ড্রামার ধারণাটি মূলত চীন থেকে আসা, যেখানে একে বলা হয় ‘ডুয়ানজু’। চীনে ২০২৪ সালে এই ক্ষুদ্র নাটকগুলোর আয় বড় পর্দার সিনেমা হলের আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ড্রামাবক্স বা রিলশর্ট-এর মতো অ্যাপগুলোর সাফল্য দেখে ভারতে ‘কুকু’ এবং ‘রিলিজ’ (Reelies)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই নতুন জোয়ারের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
১. সময় সাশ্রয়ী: অফিসের লাঞ্চ ব্রেক বা যাতায়াতের পথে ২ মিনিটে একটি পর্ব দেখা যায়।
২. নাটকীয়তা: প্রতিটি পর্বের শেষে এমন এক নাটকীয় মোড় (Cliffhanger) থাকে যে দর্শক পরের পর্ব দেখতে বাধ্য হন।
৩. স্ন্যাকবল কনটেন্ট: গল্পের জটিলতা কম থাকে এবং সরাসরি মূল বিষয়ে প্রবেশ করা হয়।
৪. মোবাইল ফার্স্ট: যারা কম্পিউটার বা টিভি এড়িয়ে সরাসরি স্মার্টফোনে অভ্যস্ত, তাদের জন্যই এটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা।
একটি সাধারণ মাইক্রো-ড্রামা সিরিজে প্রায় ৫০ থেকে ৮০টি পর্ব থাকে। পুরো সিরিজটি নির্মাণ করতে খরচ হয় মাত্র ১০ থেকে ২৫ লাখ রুপি। ‘কুকু’-র সিইও লাল চাঁদ বিসু জানান, তাঁরা বর্তমানে মাসে ১৫০টি শো বানাচ্ছেন, কিন্তু আগামী দুই বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে প্রতি মাসে ১ হাজারটি শো বানানোর লক্ষ্য নিয়েছেন।
এই নাটকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দর্শককে ধরে রাখা। যদি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নাটকটি দর্শককে টানতে না পারে, তবে তাঁরা দ্রুত প্ল্যাটফর্ম বদলে ফেলেন। এ ছাড়া মানহীন কনটেন্টের ভিড়ে মৌলিক গল্পের অভাবও একটি বড় সমস্যা। তবে সঞ্জিত ভাঞ্জারা বা ভিকি বাহরির মতো প্রযোজকেরা মনে করেন, মানসম্মত নির্মাণ এবং পরিচিত অভিনেতাদের যুক্ত করার মাধ্যমে মাইক্রো-ড্রামাকে একটি সম্মানজনক বিনোদন মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
সিনেমা হল বা টেলিভিশনের পর স্মার্টফোনের এই ‘মাইক্রো-ড্রামা’ বিপ্লব বিনোদন জগতের চতুর্থ বড় বিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।