দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতার ছাপ রাখছেন বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী। তেমনই এক উজ্জ্বল উদাহরণ মীর জুবায়ের আহমেদ। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি স্কলারশিপ অর্জন করেছেন।
জুবায়েরের সাফল্যের পেছনের গল্পটা সহজ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেকেন্ড টাইমার’ হিসেবে ভর্তি হওয়ায় প্রথম থেকে কিছুটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। প্রথম দুই সেমিস্টারে আশানুরূপ ফল করতে পারেননি। কিন্তু জুবায়ের সেই হতাশাকে নিজের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি; বরং তিনি উপলব্ধি করেন, সাময়িক ব্যর্থতা কখনোই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না। নিজের পড়াশোনার ধরন পরিবর্তন, নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার দিকে মনোযোগ দেন এবং নিজের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যান।
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল তিনি পান শেষ বর্ষে। ধাপে ধাপে উন্নতির মাধ্যমে তিনি সিজিপিএ ৩.১৩ ফল অর্জন করেন। তবে এই ফল তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, বরং এটি তাঁকে আরও বড় লক্ষ্য স্থির করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি বুঝতে পারেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু ভালো সিজিপিএ নয়, বরং একটি শক্তিশালী গবেষণা প্রোফাইল গড়ে তোলা জরুরি।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি প্রোগ্রামে। এখান থেকে শুরু হয় তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়। মাস্টার্সে তিনি শুধু ভালো ফল অর্জনের দিকেই মনোযোগ দেননি, বরং গবেষণাকে নিজের মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। নিয়মিত ল্যাবওয়ার্ক, শিক্ষক-গবেষকদের সঙ্গে কাজ করা এবং নতুন নতুন ধারণা নিয়ে চিন্তা করার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গবেষণামুখী একজন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
বুয়েট থেকে ৩.৬৭ সিজিপিএ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। একই সঙ্গে বায়োফিজিকসে তিনটি মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা তাঁর একাডেমিক প্রোফাইলকে শক্তিশালী করে। গবেষণার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নেন এবং পোস্টার ও ওরাল প্রেজেন্টেশন ক্যাটাগরিতে একাধিক পুরস্কার অর্জন করেন।
মাস্টার্সে অধ্যয়নকালে তিনি টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (টিএ) এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (আরএ) লাভ করেন।
এর মাধ্যমে তিনি যেমন শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তেমনি গবেষণার বাস্তব পরিবেশেও নিজেকে আরও পরিণত করে তোলেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর ভবিষ্যৎ অ্যাকাডেমিক যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি ডুয়োলিঙ্গো ইংলিশ টেস্টে
অংশ নিয়ে ১২০ স্কোর করেন, যেখানে প্রতিটি সেকশনেই তাঁর সমান দক্ষতা প্রতিফলিত হয়। সময় ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে আইইএলটিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলেও তিনি বিকল্প পথ বেছে নিয়ে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে, ইচ্ছা থাকলে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পথ তৈরি করা সম্ভব।
নিজের আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে জুবায়ের বলেন, ‘এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না; প্রতিটি ধাপে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে কখনো থেমে যাইনি। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমাকে আরও দৃঢ় করেছে এবং এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। আমার মা, স্ত্রী, পরিবার, শিক্ষকেরা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
জুবায়েরের এই পুরো যাত্রায় সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস। তিনি কখনো লক্ষ্যচ্যুত হননি, কখনোই সহজ পথ বেছে নেননি; বরং প্রতিটি ধাপে ধৈর্য, পরিশ্রম এবং একাগ্রতার মাধ্যমে এগিয়ে গেছেন।
অবশেষে তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি আসে, যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে ফুল ফান্ডেড টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট/গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট রিসার্চার (টিএ/জিএসআর) পজিশনে পিএইচডি করার সুযোগ পান।
পাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. লোকমান আলী বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বড় অর্জন, একই সঙ্গে বিভাগের জন্যও অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। আমরা চাই, এভাবেই আমাদের বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাক। জুবায়ের শুরু থেকে মেধাবী এবং অনেক পরিশ্রমী শিক্ষার্থী ছিল। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।’