পদার্থবিজ্ঞানের জগতে রিচার্ড ফাইনম্যান ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম। নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী কঠিন তাত্ত্বিক বিষয়ও খুব সহজ করে বোঝাতে পারতেন। ফাইনম্যান বিশ্বাস করতেন, কোনো বিষয় সত্যিই বুঝতে পারলে সেটি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে জনপ্রিয় হয়েছে ‘ফাইনম্যান পদ্ধতি’। আমাদের পড়াশোনার বড় একটি সমস্যা হলো না বুঝে মুখস্থ করা। এই অভ্যাস বদলাতে কাজে লাগতে পারে ফাইনম্যান পদ্ধতি।
শুরুতে ঠিক করুন, কী শিখতে চান। বিষয়টির নাম খাতার ওপরে লিখে নিন। এরপর সেই বিষয়ে আপনি আগে থেকে যা জানেন, তা নিজের ভাষায় লিখতে শুরু করুন। শুরুতে বড় কোনো অধ্যায় হাতে নেওয়ার দরকার নেই। ছোট একটি বিষয় বেছে নিন। চার-পাঁচ পৃষ্ঠার মধ্যে নোট করা যায়, এমন কোনো বিষয় দিয়ে শুরু করা ভালো। ধরা যাক, আপনি মাইক্রোইকোনমিকস শিখছেন। প্রথম দিন ডিমান্ড ও সাপ্লাই নিয়ে পড়তে পারেন। পরের দিন পড়তে পারেন মার্কেট ইকুইলিব্রিয়াম। বিষয় ছোট হলেও শেখার ক্ষেত্রে কোনো ফাঁক রাখবেন না। যা জানেন, লিখুন। নতুন কিছু শিখলে সেটিও যোগ করুন। এই ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিন্তা করা। পড়ার সময় মনোযোগ নষ্ট করে এমন জিনিস দূরে রাখুন। ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও নিজের মনকে পুরোপুরি পড়ার মধ্যে রাখুন।
এবার আসল কাজ। খাতায় এমনভাবে লিখুন, যেন আপনি কাউকে বিষয়টি বোঝাচ্ছেন। শুধু বইয়ের ভাষা কপি করে লিখবেন না। নিজের ভাষায় লিখুন। কঠিন শব্দের জায়গায় সহজ শব্দ ব্যবহার করুন। কোথাও আটকে গেলে বুঝতে হবে, সেই জায়গায় আপনার বোঝার ঘাটতি আছে। প্রথমে বই দেখে বিষয়টি বুঝে নিন। প্রয়োজনে ইন্টারনেট, ভিডিও বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎসের সাহায্য নিন। এরপর বই বন্ধ করে নিজের মতো করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন। ভাবুন, আপনার সামনে একজন শিক্ষার্থী বসে আছে। তাকে আপনি পুরো বিষয়টি পড়াচ্ছেন। সে প্রশ্ন করবে। তার প্রশ্ন আপনাকে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিনতে সাহায্য করবে। কাউকে বোঝাতে গেলে কোথায় জ্ঞান অসম্পূর্ণ, কোথায় ধারণা অস্পষ্ট, তা সহজে ধরা পড়ে। তখন সহজে ধরা পড়ে।
শেখার সময় কোথাও আটকে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। কোনো একটি ধারণা বুঝতে না পারলে পরের অংশে চলে যাওয়ার অভ্যাস অনেকের আছে। এতে শেখার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। কোনো জায়গায় আটকে গেলে আবার আগের অংশে ফিরে যান। বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায় পড়ুন। প্রয়োজনে অন্য কোনো উৎস থেকে বিষয়টি বুঝে নিন। তারপর আবার নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করুন। একবার পড়েই কোনো বিষয় পুরোপুরি আয়ত্ত হয়ে যায় না। অনুশীলন দরকার। পড়ার পর কিছু সময় রেখে আবার বিষয়টি মনে করার চেষ্টা করুন। অনেক শিক্ষার্থী এক দিনে অনেক কিছু পড়ে ফেলে। পরে আর সেগুলো ঝালাই করে না। পরীক্ষার হলে তখন পরিচিত প্রশ্নও কঠিন মনে হয়। উত্তরটি জানা আছে, কিন্তু মনে করার মতো করে সাজানো নেই। ফাইনম্যান পদ্ধতি এই জায়গায়ও কাজে আসে। দেখুন, বই না দেখে কতটা বলতে পারছেন।
কোনো বিষয় সহজ ভাষায় বলতে পারা মানে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা। তাই কঠিন বিষয়কে সহজ করার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে উদাহরণ দিন। উপমা ব্যবহার করুন। ছন্দ তৈরি করুন। গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। নিজের জীবনের পরিচিত কোনো ঘটনার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করতে পারেন। ধরা যাক, অর্থনীতির কোনো ধারণা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। সেটিকে দৈনন্দিন জীবনের কেনাকাটা, বাজার বা পরিবারের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। এভাবে বিষয়টি মস্তিষ্কের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। মনে রাখাও সহজ হয়। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এত সময় দিয়ে পড়ার কী প্রয়োজন? ভাবুন, কয়েক সেমিস্টার আগে পড়া একটি বিষয় হঠাৎ কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে। তখন বই খুলে বসার সুযোগ না-ও থাকতে পারে। আবার পরীক্ষার হলে পরিচিত একটি প্রশ্ন দেখে মনে হতে পারে, উত্তরটি জানা আছে। কিন্তু কিছুতেই সাজিয়ে লেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে কাজে আসে গভীরভাবে শেখার অভ্যাস।
কোনো বিষয় পড়ার পর সেটি অন্য কাউকে শেখানোর চেষ্টা করুন। এতে নিজের জ্ঞান যাচাই হয়। দুর্বল জায়গাগুলো ধরা পড়ে। ফাইনম্যান পদ্ধতির মূলকথাও খুব সহজ। পড়ুন। বুঝুন। নিজের ভাষায় বলুন। যেখানে আটকে যাবেন, সেখানে আবার ফিরে যান। তারপর বিষয়টিকে আরও সহজ করে বলুন। শেখার শেষ ধাপ আসলে অন্যকে শেখানো। কারণ, কাউকে শেখাতে গেলে নিজের শেখাটাই সবচেয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা হয়ে যায়।