মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক আমদানি শুল্ককে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করার পর এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো তাদের দেওয়া আনুমানিক ১৭৫ বিলিয়ন (১৭ হাজার ৫০০ কোটি) ডলার কীভাবে ফেরত পাবে। আদালত এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বাতলে দেয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘এই অর্থ ফেরতের বিষয়টি নিয়ে আমাদের হয়তো আগামী পাঁচ বছর আদালত চত্বরেই কাটাতে হবে।’
শুল্ক সংগ্রহের পদ্ধতি ও বর্তমান জটিলতা
যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রেই আমদানিকারককে ‘কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন’ এজেন্সির কাছে একটি বন্ড জমা দিতে হয় এবং পণ্যের আনুমানিক শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। সাধারণত পণ্য প্রবেশের ৩১৪ দিন পর শুল্কের চূড়ান্ত নির্ধারণ বা ‘লিকুইডেশন’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। যদি আমদানিকারক অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে থাকেন, তবে তা ফেরত দেওয়া হয়। এর আগে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলাকালীন অনেক আমদানিকারক এই লিকুইডেশন প্রক্রিয়া বন্ধের আবেদন জানালেও আদালত তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যা নেই
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ককে অবৈধ বললেও তা কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে সে বিষয়ে নীরব ছিলেন। তবে বিচারপতি ব্রেট কাভানাফ সতর্ক করেন, এই রায়ের ফলে অদূর ভবিষ্যতে গুরুতর ব্যবহারিক সমস্যা তৈরি হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, শুনানির সময় এটি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল যে এই বিপুল পরিমাণ রিফান্ড বা অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটি একটি ‘বিরাট বিশৃঙ্খলা’ তৈরি করতে পারে। এখন এই অর্থ ফেরতের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পুনরায় ‘কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে যেতে হবে।
রিফান্ড যেভাবে কার্যকর হতে পারে
ইতিমধ্যেই ১ হাজারেরও বেশি আমদানিকারক রিফান্ড চেয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে মামলা করেছেন এবং সামনে নতুন মামলার ঢল নামার সম্ভাবনা রয়েছে। গত ডিসেম্বরে আদালত রায় দিয়েছিলেন, চূড়ান্ত শুল্ক নির্ধারণের প্রক্রিয়া পুনরায় খতিয়ে দেখার এবং সুদসহ অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনও আদালতের এই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ না করার কথা জানিয়েছে। ফলে রিফান্ড প্রক্রিয়ার আইনি জটিলতা কিছুটা কমলেও ব্যবহারিক জটিলতা রয়েই গেছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বাধা
মার্কিন বাণিজ্য আইন অনুযায়ী, অর্থ ফেরতের দাবি জানানোর জন্য আমদানিকারকদের হাতে দুই বছর সময় থাকে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি কোম্পানিকে আলাদাভাবে মামলা করতে হতে পারে, কারণ সব কোম্পানির জন্য কোনো ‘ক্লাস অ্যাকশন’ বা সামষ্টিক মামলা সম্ভব হবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই প্রক্রিয়াটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ বড় কোম্পানিগুলোর তুলনায় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি খরচ বহন করার সক্ষমতা কম। ফলে অনেক ছোট আমদানিকারক রিফান্ডের আশা ছেড়েও দিতে পারেন।
অতীতে কী এমন ঘটনা ঘটেছিল
এর আগে ১৯৮৬ সালে ‘হারবার মেইনটেন্যান্স ট্যাক্স’ অসাংবিধানিক ঘোষিত হওয়ার পর ১ লাখেরও বেশি দাবিদারকে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া তদারকি করেছিল কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত। বিচারক জেন রেস্তানি সেই বিশাল প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছিলেন, যিনি এখনো এই আদালতে কর্মরত আছেন। তাই বড় আকারের রিফান্ড সামলানোর অভিজ্ঞতা এই আদালতের রয়েছে।
বিশৃঙ্খলা এড়ানোর উপায় কী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের কাছে শুল্ক পরিশোধের সঠিক রেকর্ড রয়েছে, যা রিফান্ড করার কাজ সহজ করতে পারে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দাবি তুলছেন, সরকার যেন নিজ থেকেই ‘অটোমেটিক রিফান্ড’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত দেয়। তাদের ভয়, সরকার যদি প্রতিটি কাগজের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা শুরু করে, তবে প্রক্রিয়াটি আরও মন্থর হয়ে যাবে।
এমনকি রিফান্ড দেওয়া হলেও অনেক কোম্পানি টাকা নাও পেতে পারে। যদি কোনো কোম্পানি সরাসরি ‘আমদানিকারক’ না হয়ে থাকে, তবে চুক্তি অনুযায়ী টাকা কে পাবে তা নিয়ে নতুন আইনি বিবাদ তৈরি হতে পারে। এই জটিলতার আশঙ্কায় অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যেই তাদের রিফান্ড পাওয়ার অধিকারটি ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে শুরু করেছে।