দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী, প্রতিযোগিতাসক্ষম এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে কর ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের রূপান্তরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অটোমেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এবারের বাজেটের প্রধান আকর্ষণ হলো ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রগতিশীল করমুক্ত সীমার রোডম্যাপ ঘোষণা করা। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) প্রসার এবং দেশীয় শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে কাস্টমস আইনে কিছু প্রস্তাব আনা হয়েছে।
কাস্টমস আইনে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক শুল্ক (Protective Tariff) আরোপের একাধিক প্রস্তাব এসেছে:
মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল: বিশ্বের অন্যান্য দেশের আদলে বাংলাদেশেও কাস্টমস আইনের অধীনে ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ বা ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে পণ্য সংরক্ষণ, গ্রেডিং ও প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা যাবে।
স্থানীয় বাইসাইকেল শিল্পের সুবিধার্থে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ (ফ্রি হুইল) আমদানিতে শুল্ক ১৫% থেকে বাড়িয়ে ২৫% করার পাশাপাশি নতুন করে ৫% রেগুলেটরি শুল্ক প্রস্তাব করা হয়েছে।
কাগজ শিল্পের সুরক্ষায় গ্রিজ প্রুফ ও গ্লাসিন পেপার আমদানিতে আমদানি শুল্ক ১০% থেকে বাড়িয়ে ২৫% এবং ৫% রেগুলেটরি শুল্ক প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় ওয়াশিং মেশিন শিল্পের প্রতিরক্ষণে আমদানিকৃত গৃহস্থালি ওয়াশিং মেশিনে ২০% সম্পূরক শুল্ক এবং জিপসাম বোর্ডের ওপর ২০% রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওয়াশিং মেশিন উৎপাদনে ব্যবহৃত ফ্লোট গ্লাস আমদানির ৪৫% সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিন আমদানিতে শুল্ক ৫% থেকে বাড়িয়ে ১০% এবং মেইজ স্টার্চ আমদানিতে শুল্ক ১৫% থেকে বাড়িয়ে ২৫% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মোবাইল ফোন ও এসি-ফ্রিজের মতো কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বজায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশের বিমানবন্দর ও বন্দরগুলোতে বাণিজ্য কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে নীতিমালার বড় পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে:
আইসিডিতে ১০০% বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম: বেসরকারি অফডক ও আইসিডি (Inland Container Depot) পরিচালনায় বিদ্যমান নীতিমালায় বিদেশি মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ৪৯% থাকার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা বিলোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এয়ারকার্গো অপারেটর স্টেশন: বিশ্বের স্বনামধন্য লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করে বিমানবন্দরগুলোতে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাব তৈরির জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এর ফলে দেশের ই-কমার্স খাতের ব্যাপক অগ্রগতি হবে এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক ই-কমার্স হাবে পরিণত হতে পারবে।
বেসরকারি বন্দর পরিচালনা: দেশে গ্রিনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট আকৃষ্ট করতে বেসরকারি বন্দর এবং টার্মিনাল অপারেটর সংক্রান্ত বিশেষ বিধিমালা জারির প্রস্তাব করা হয়েছে।