মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই বাজারে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক—রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, তবে আগের মতো আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো দেশটির ক্রেতারা বাংলাদেশের প্রতি ইউনিট পোশাকের দাম ২ শতাংশের বেশি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও মূল্য কমে যাওয়ার কারণে রপ্তানির মোট আয় আগের মতো রাখতে পারছে না। এই ধারা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি চিত্রে মিশ্র সংকেত তৈরি করেছে এবং রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতাকে এখন চাপের মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটেক্সা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে প্রতি বর্গমিটার পোশাকের দাম ছিল ৩ ডলার ৬ সেন্ট, যা চলতি বছরে নেমে এসেছে ৩ ডলারে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আমদানি করা পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, যা বাজারে মূল্য চাপের একটা দ্বৈত পরিস্থিতিই তুলে ধরছে।
ওটেক্সার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কম দামে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এর ফলে রপ্তানির পরিমাণ আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও আয়ে সেই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে একই সময়ে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯ কোটি ১৭ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৭৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে প্রায় ১ শতাংশ কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা ও মূল্যকাঠামোর পরিবর্তনের ফল, অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক চাপের প্রতিফলন। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক ক্ষেত্রেই কম দামে রপ্তানি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা ইউরোপীয় বাজার থেকে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে, যা সামগ্রিক মূল্যকাঠামোয় প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশও উচ্চমূল্যের পণ্যে যেতে পারে, তবে এর জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের বিনিয়োগ, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়।
ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতেও ধীরগতি এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশটি ৬ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ প্রায় ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। এই সংকুচিত বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ায় দাম কমানোর চাপ বাড়ছে।
তবে কম দামের প্রভাব সব দেশে একইভাবে পড়েনি। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ইউনিট মূল্য কমলেও রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে। এটি ইঙ্গিত করে, কম দামের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশ থেকে বেশি পরিমাণে পণ্য নিচ্ছে। বিপরীতে চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে ইউনিট মূল্য ও রপ্তানি—দুটিই কমেছে, যা বাজারে তাদের অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। দেশটির রপ্তানি মূল্য ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পরিমাণ ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়েছে, যদিও ইউনিট মূল্য সামান্য কমেছে। ইন্দোনেশিয়াও ভালো অবস্থানে রয়েছে—রপ্তানি মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং পরিমাণ ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে কম্বোডিয়ায়, যেখানে রপ্তানি মূল্য বেড়েছে ২৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং পরিমাণ ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
অন্যদিকে চীন বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির পোশাক রপ্তানি মূল্য ৬২ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং পরিমাণ ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা—রপ্তানি মূল্য ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং পরিমাণ ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমেছে।