ঈদুল আজহার পরপরই রাজশাহীর লাউয়ের বাজারে ধস নেমেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের মাঠ ও সড়কের পাশের অস্থায়ী বাজারে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা দরে। অথচ সেই একই লাউ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকায়। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিপুল লাভ করলেও উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ঈদের আগে প্রতি পিস লাউ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হলেও মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম নেমে এসেছে ৫ টাকায়। এ দামে বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে দাবি তাঁদের।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার জেলায় রেকর্ড পরিমাণ লাউ উৎপাদন হয়েছে। গত বছরের ৫২১ হেক্টরের পরিবর্তে এবার ৬৬৬ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে দুর্গাপুর, বাঘা, গোদাগাড়ী, পবা ও পুঠিয়া উপজেলায়।
সরেজমিনে দুর্গাপুর, পুঠিয়া ও বাগমারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে মাচায় ঝুলছে লাউ। রাস্তার মোড়, গ্রামীণ হাট ও জমির পাশেই চলছে কেনাবেচা। ঈদের আগে যে লাউ প্রতি পিস ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন নেমে এসেছে ৫ টাকায়।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, হঠাৎ সরবরাহ বেড়ে যাওয়া, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য—এই তিন কারণে দাম পড়ে গেছে।
দুর্গাপুর উপজেলার লাউচাষি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘১৫ কাঠা জমিতে লাউ চাষ করেছি। শুরুতে ৩২ টাকা করে বিক্রি করেছি। এখন ৫ টাকা বললেও ক্রেতা পাওয়া যায় না। এই দামে বিক্রি করলে খরচই উঠবে না।’
তবে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে লাউ কিনলেও দেশের বিভিন্ন বাজারে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদ ও পরিবহন সংকটের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা কম দামে লাউ কিনে পরে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন পাইকারেরা। স্থানীয় বাজার থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক লাউ যাচ্ছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রামে।
ঢাকার মহাখালীতে বসবাসকারী নওপাড়া গ্রামের কামরুল হাসান বলেন, গ্রামে লাউয়ের কোনো দাম নেই। অথচ ঢাকার বাজারে সাধারণ মানুষকে কয়েকগুণ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। দুর্গাপুর সদর মোড়ে গতকাল রোববার সকালে লাউ কিনছিলেন পাইকার আবদুল আলীম। তিনি বলেন, ঈদের কারণে চালক-হেলপারের সংকট রয়েছে। পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। মাঠে দাম কম হলেও পরিবহন ও ঝুঁকির কারণে খুব বেশি লাভ থাকে না।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাজারে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, গ্রাম ও শহরের বাজারে সবজির দামের বড় ব্যবধান অনেক সময় সিন্ডিকেটের কারণেও তৈরি হয়। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়।
নাসির উদ্দিন আরও বলেন, আলু ও পেঁয়াজ তোলার পর একই জমিতে অনেক কৃষক লাউ চাষে ঝুঁকেছেন। এতে উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু সে অনুপাতে বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।