একসময় দেশের বাইরে ভ্রমণ বা কেনাকাটার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিদের কাছে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি ছিল। এখন সেই চিত্র বদলেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সংসারের ব্যয় মেটাতে, পাশাপাশি বিভিন্ন মূল্যছাড় ও কিস্তি সুবিধার সুযোগ নিতে দেশের ভেতরেও দ্রুত বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা, যা এপ্রিল মাসের ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা থেকে ১০ শতাংশের বেশি এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মোট লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ড এখন শুধু বিলাসী কেনাকাটার নয়, বরং দৈনন্দিন বাজারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নের মাধ্যম হয়ে উঠছে।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতিতে অনেক পরিবারের মাসিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। ফলে বড় অঙ্কের খরচ সাময়িকভাবে সামাল দিতে অনেকেই ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছেন। অন্যদিকে সুপারশপ ও বড় খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে কার্ড গ্রহণের সুবিধা, ছাড় এবং কিস্তি সুবিধা গ্রাহকদের আরও উৎসাহিত করছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্ড বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নগদ অর্থ বহনের পরিবর্তে শহুরে গ্রাহকদের মধ্যে কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, তবে মূল্যস্ফীতির চাপও এই প্রবণতা ত্বরান্বিত করেছে। গ্রাহক ধরে রাখতে ব্যাংকগুলোও নিয়মিত বিভিন্ন অফার দিচ্ছে।
দেশের ভেতরে ব্যবহার বাড়ার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ক্রেডিট কার্ডের ঋণসীমা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে সুদের সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ শতাংশ।
শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও বাংলাদেশিদের কার্ড ব্যবহার বেড়েছে। মে মাসে বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা ৪২৫ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, এরপর যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, ভারত ও মালয়েশিয়ায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ডে লেনদেন বেড়েছে বার্ষিক হিসাবে ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ হলেও মাসভিত্তিক ব্যয় কমে ৩১২ কোটি টাকায় নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষ সাময়িক স্বস্তি পেতে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছেন। তবে এই প্রবণতা যদি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তা নতুন আর্থিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্ডের ব্যবহার বাড়ায় ডিজিটাল লেনদেন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারিত হলেও সাইবার নিরাপত্তা, গ্রামাঞ্চলের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি মোকাবিলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।